প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে তাদের উপযোগী কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ছাড়াও বিসিএসসহ সকল শ্রেণির সরকারি চাকরিতে অটিজমসহ সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা সংরক্ষিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অটিজমসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি, সকলের সমন্বিত উদ্যোগ ও উপযোগী পরিবেশ পেলে অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে উঠে আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনা বয়ে আনবে।
রবিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দশম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রতিবন্ধী শিশুদের সাধারণ বিদ্যালয়ে ভর্তি না করার মন-মানসিকতা ত্যাগ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধিতার কারণে কোন শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রাখা যাবে না।
তিনি বলেন, ‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সকল শিশু সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করবে। ফলে এ ধরনের সকল শিশুরা নিজ পরিবার থেকে বাড়ির নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে সাধারণ শিশুরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সাথে মিশে মানুষের ভিন্নতা সম্পর্কে জানবে এবং ভিন্নতাকে মেনে নেয়ার শিক্ষা পাবে।’
শিক্ষাকে তার সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১০ সালে একটি বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রতিবন্ধিতার কারণে কোন শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা যাবে না’।
শেখ হাসিনা বলেন, এতে করে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা লাভ করবে। এতে গোটা সমাজ ব্যবস্থাই উপকৃত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্য-সম্পন্ন ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার, ইন্টারনেটেও অন্য সবার মতোই সমান পারদর্শিতার সাথে কাজ করতে সক্ষম। তিনি প্রতিবন্ধীবান্ধব সফটওয়্যার, অডিও-ভিডিও শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ তথ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে আমি সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি অনুরোধ জানান।
তার সরকার অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ পাশ করেছে এবং এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের ভবিষ্যত জীবনের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই আইনের আওতায় একটি নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট গঠন করেছি। ট্রাস্টের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে আমরা ৪১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিয়েছি এবং আমি চাই সমাজের বিত্তবানরা এখানে সহায়তা করবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘ডিজ্যাবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেম’ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী ‘প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৮শ’ প্রতিবন্ধীর ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালার আওতায় ৬২টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৮ হাজার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।
অটিজম বৈশিষ্ট্রসম্পন্নদের জন্য সরকারের সুযোগ- সুবিধা প্রদান প্রসংগে তিনি বলেন, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন ও উইথ অটিজম’ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমপ্লেক্স নির্মিত হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত শিশু শনাক্তকরণসহ বিনামূল্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালু রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকারের উদ্যোগে জাতীয় প্রতিবান্ধি ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘আপনারা প্যারা অলিম্পিক ও স্পেশাল অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করেছেন। তাই আমরা অটিজম বৈশিষ্ট্য-সম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের জন্য ঢাকার অদূরে সাভারে ১২ একর জমিতে ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমরা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াই। তারা আমাদেরই আপনজন।
অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্ব শেষে অটিজম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. মো. মোজাম্মেল হোসেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জিল্লার রহমান স্বাগত বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ের উর্ধ্বতন কমৃকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং অটিজম আক্রান্ত শিশু-কিশোর, অভিভাবক ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে অটিজম অতিক্রমে সফল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে বিশেষ সম্মাননা দেন।







