খোলা কলাম

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা ও তার সমাধান

স্বরুপ দাস, প্রশি, আজমপুর সপ্রাবি, কেন্দ্রিয় যুগ্ন আহবায়ক, আহবায়ক খুলনা বিভাগ, সাধারন সম্পাদক, দামুড়হুদা, বাসপ্রাবি প্রধান শিক্ষক সমিতি
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের কারণে সমাজে ও পরিবারে নানাবিধ সমস্যা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। ফলে বেশিরভাগ পরিবারে দ্বন্দ্ব ও কলহ বিরাজ করে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। শিক্ষা সম্পৃক্ত বিষয় তার কাছে উপযোগিতা পায় না। শিক্ষকের পাঠদান তার ভেতরে সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। অতি মেধাবী, চঞ্চল ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা যদি মেধা অনুযায়ী শিখন পরিবেশ না পায় সেক্ষেত্রেও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সহযোগিতার জন্য যে ম্যানেজিং কমিটি থাকে তাও অনেক সময় ক্ষুদ্র কোনো বিষয়ে ইস্যু তৈরি করে বিশাল সমস্যায় পরিণত করে। ফলে শিক্ষকরা অনেক সময় অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

অনেক শিক্ষক আছেন, সম্মান হারানোর ভয়ে সঠিক কথা বলতে পারেন না। যে শিক্ষক সমাজে শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র, সেই শিক্ষককে অপমানিত হতে হয় ব্যবস্থাপনা কমিটির শিক্ষিত ও অশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে। যে শিক্ষকের মাথা উঁচু করে থাকার কথা, সেই শিক্ষককে সইতে হয় অপমান আর গ্লানি। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা অনেক সময় বিদ্যালয়ে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি করেন। অনেক সময় এতে শিক্ষক নামের কলঙ্করূপী কিছু শিক্ষকের যোগসাজশও থাকে। ফলে স্কুলের আর উন্নয়ন হয় না।

তবে বিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির ইতিবাচক দৃষ্টান্তও আছে আমাদের দেশে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয় অবিরত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের পথে এগিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

শিক্ষাদান করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের যে আয়োজন থাকার কথা তার প্রতিফলন কি সব স্কুলে সব শিক্ষক ঘটান? উত্তর অবশ্যই আশাব্যঞ্জক হবে না। প্রতিটি স্কুলে উপকরণ সরবরাহ করা হয়। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন হয় না। এই সত্যটা উল্লেখ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মে নিযুক্ত পেশাজীবীরা আবার ক্ষেপে ওঠেন। যেন মানুষ সব দোষের ঊর্ধ্বে। তারা তো কোনো অন্যায় করতে পারে না। যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেই বলছি। ক’জন শিক্ষক নিজের কর্মের আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মোপলব্ধি করেন? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শ্রেণী পরিদর্শন করবেন। সেজন্য উপকরণ ও পাঠ পরিকল্পনা ক্লাসে নিতে হবে; স্বভাবত প্রশ্ন জাগে—তাহলে অন্য সময়? অন্য সময়ের গুরুত্ব কি বৃথা যাবে? ওই বিষয়টি কি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাঠ দেয়া হবে না শিক্ষার্থীকে? যদি শিক্ষার্থীর উদ্দেশে পাঠ দেয়ার কথা থাকে, তাহলে তো সেটা চলমান থাকার কথা। তবে সব ক্ষেত্রে এই বক্তব্য সঠিক নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো দৃষ্টিগোচর হয়। এছাড়া পেশার প্রতি আন্তরিকতা কর্মের মানকে বহুগুণ সমৃদ্ধ করে। আন্তরিকতা দিয়ে অনেক অসাধ্য কাজও সম্পন্ন করা যায়।

শিক্ষকরা পেশার প্রতি কতটা আন্তরিক তা দেখা যায় তার কর্মতত্পরতার মধ্য দিয়ে। এছাড়া অনেকে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগান। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা সে দলের পরিচয় দিয়ে হোমরা-চোমরা বনে যান। এ কারণে শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করেন না। প্রধান শিক্ষকের নির্দেশনা মানেন না।
আবার কিছু শিক্ষক আছেন, পেশাগত জীবনের চেয়ে নিজের ব্যক্তিজীবনকে বেশি প্রাধান্য দেন। ফলে গল্প-আড্ডা ও উপরি পাওয়ার বিষয়গুলো তাদের মনে স্থান পায় বেশি। শ্রেণীর পাঠদান প্রক্রিয়া সফল করার বিষয়টা হয়তো তাদের মনেই থাকে না।

শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে শুধু শিক্ষার্থীদের কাজই দিল কিন্তু বিষয়ের ধারণা দিল না, তাহলে শিক্ষার্থী বিষয়টা বুঝবে কীভাবে? বিষয়ের উপস্থাপনা যদি শিক্ষার্থীর মনে চিন্তার ডানা না মেলে তবে তো যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরে রয়ে যাবে। অনেক শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে বলতে শোনা যায়, এগুলো একেবারে গাধা। স্বীকার করি এরা গাধা। কিন্তু গাধাকে তো প্রয়োজনীয় খাবার দিতে হবে। না হয় বোঝা টানবে কীভাবে? তবে এটা ধ্রুব সত্য, বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের আর্থ-সামজিক অবস্থার কারণে যথাযথ সাড়া দেয় না। যা অনেক সময় শিক্ষককে হতাশায় নিমজ্জিত করে। শিক্ষক শুধু পড়িয়ে যাবেন, পরিশ্রম করে যাবেন, সে অনুযায়ী ফল না এলে কষ্ট লাগারই কথা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর গৃহে শিক্ষার যে তদারকি ব্যবস্থা চালু থাকার কথা তা পরিচালিত হয় না।

মা-বাবা, বড় ভাই-বোন অনেক সময় খোঁজখবরও রাখেন না। বাবা-মা মনে করেন, জন্ম দেয়ার কাজ ছিল জন্ম দিলাম। মানুষ করার দায়িত্ব শিক্ষকের। শিক্ষক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, পাঠ্য বিষয় বোধগম্য করে দিতে পারেন, প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করতে পারেন; কিন্তু শিক্ষা অর্জনের প্রাথমিক স্তর হলো পরিবার। পরিবার থেকে যদি শিক্ষার্থী আচরণ না শেখে, মানব চরিত্রের মহত্ গুণগুলো না শেখে, পরিবারেই যদি থাকে অনিয়ম, মিথ্যা, কলহ ও জরাজীর্ণ পরিবেশ—তবে সেই পরিবেশ শিক্ষার্থীর মনে কী প্রভাব ফেলবে তা তো সহজেই অনুমেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পরিবার থেকে যে সহযোগিতা পাওয়ার কথা তা পায় না। উপরন্তু পরিবারকে শিক্ষার্থীর সহায়তা করতে হয়। সেটা হতে পারে পাতা কুড়িয়ে, লাকড়ি সংগ্রহ করে কিংবা গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে। ফলে শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে এসে বইগুলো যেভাবে বাড়িতে রাখে, আবার বিদ্যালয়ে আসার পথে সেভাবেই বইগুলো নিয়ে নেয়। বাড়িতে অবস্থানকালে বইগুলো পড়া ও চর্চা করা শিক্ষার্থীর কর্মের পরিসরে পড়ে না। হয়তো খেলাধুলা করে, কাজ করে, ঘোরাফেরা, মারামারি কিংবা কলহ সৃষ্টি করে সময় কাটায়।

প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে আরও একটি অন্যতম অন্তরায় হচ্ছে শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মে সম্পৃক্ত করা। ভোটার তালিকা তৈরি, জরিপ, বিভিন্ন তথ্য ছক পূরণ—এসব কর্মে শিক্ষকদের ওপর বিরাট চাপ পড়ে। এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বোঝা উচিত। একদিকে ছোট ছোট শিশুদের প্রতি দায়িত্ব পালন, বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলাম তার ওপর এত সব কর্ম—এত নৌকায় পা দিয়ে কোন নৌকায় করে গন্তব্যে যাবেন শিক্ষকরা। শিক্ষকরা সমাজে শ্রদ্ধার পাত্র। জরিপের কাজে, ভোটার তালিকার কাজে কিংবা অন্য কোনো কাজে যখন বিভিন্ন বাড়িতে গমন করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হন।

এটা অবশ্যই আশার কথা, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে অনেক যোগ্য লোকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যোগ্য লোক যদি যোগ্য জায়গায় স্থান না পায় তবে সেক্ষেত্রেও মরিচা ধরার সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যায় না। অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে অনেকে এখানে প্রবেশ করে, পরে নিস্পৃহ হয়ে পড়ে। হারিয়ে যায় আলোর কণাগুলো। এই আলোর বিন্দুগুলোকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। এদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। বিকশিত করার জন্য অবস্থান তৈরি করতে হবে। তবেই অগ্নিবিন্দু শিখায় শিখায় আলো ছড়াবে। আর এই আলোর সমাহার আমাদের সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি হলেও এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত গতিতে চলছে। বেশকিছু সংখ্যক মানুষের ইচ্ছা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এগোচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে কর্মরত প্রত্যেকের মনে দেশের প্রতি যদি থাকে ভালোবাসা ও মমত্ববোধ, ছোট ছোট শিশুগুলোকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দীক্ষা দেয়া যায়, তাহলে এদেশ হয়তো অতীতের গ্লানি মুছে ভবিষ্যতের জন্য সোনালি দিন উপহার দিতে পারবে। তখন যদি আমরা পৃথিবীতে নাও থাকি, নাও দেখতে পারি সেই সোনালি প্রভাত, তবুও দুঃখ থাকবে না। কারণ এই বীজটা যে আমাদের শিক্ষকরাই বুনেছিলেন।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অনার্সে ভর্তি শিক্ষার্থীরা

এস কে দাস: admissionকোন পদ্ধতিতে হবে অনার্স ভর্তি? ভর্তি পরীক্ষা, নাকি এসএসসি ও এইচএসসির ফলের ভিত্তিতে? শিক্ষা জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারী বেসরকারী কলেজগুলোতে ভর্তিচ্ছু লাখ লাখ শিক্ষার্থী। আগামী ১ অক্টোবর থেকে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও জানানো হয়নি কোন পদ্ধতিতে ভর্তি হবে শিক্ষার্থীরা। জুন মাসে এক অনুষ্ঠানে উপাচার্য ভর্তি পরীক্ষা উঠিয়ে দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসির ফলের ভিত্তিতে ভর্তির কথা জানালেও এ নিয়ে এখন আর কেউ কথা বলছেন না। অনিশ্চয়তায় পড়ে ইতোমধ্যেই ভর্তি পরীক্ষা বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের অষ্পষ্ট অবস্থানে অসন্তোষ বাড়ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মাঝে। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার কিছু না বললেও জানা গেছে, চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা। কয়েক দফা বৈঠক হলেও এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন কর্তাব্যক্তিরা। একাধিক কর্মকর্তা বৈঠকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশীদের কাছে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরলেও তিনি বলেছেন, ভর্তি বিজ্ঞপ্তির সময় বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হবে। উপাচার্যের এমন নির্দেশের পর এখন আর কেউ গণমাধ্যমের কাছেও পরিষ্কার করতে রাজি হচ্ছেন নাÑ আসলে ভর্তির বিষয় কী করা হবে? চলতি বছর এসএসসির ফলের ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিকের ভর্তি প্রক্রিয়ায় গিয়ে যে কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে সে কারণেও ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করার বিপক্ষে অনেক কর্মকর্তা। অনেক শিক্ষাবিদও এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছেন।
জানা গেছে, সারাদেশের অনার্স পর্যায়ের কলেজগুলোতে সব সময় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রক্রিয়াটি শেষ করা হয়। অনলাইনে আবেদন করে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে এ নিয়ে বিড়ম্বনাও কমেছে। কিন্তু এবার জুন মাসে হঠাৎ করেই উপাচার্য সিনেট অধিবেশনে জানান, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এসময় তিনি ভর্তি কার্যক্রম এগিয়ে আনা এবং ১ ডিসেম্বর থেকে ক্লাস শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান। বিষয়টি নিয়ে এক মাস ধরে পরীক্ষার্থীদের দিক থেকে আপত্তি উঠলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়ায় বড় ধরনের কর্মসূচী দেননি তারা।
এরই মধ্যে সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির বৈঠকের পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তি অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে ভর্তি পরীক্ষা বহাল রাখার দাবি জানানো হলেও এ বিষয়ে কোন তথ্যই দেয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আগামী ১ অক্টোবর থেকে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা হবে নাকি অন্য কিছু হবে কিছুই জানানো হয়নি। কয়েক দিন ধরে এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা হলেও কোন সাড়া নেই কর্তৃপক্ষের। তাদের একটিই উত্তর, পরে জানানো হবে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অবস্থানকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী মানববন্ধন, সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচী শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও প্রদান করেছে। প্রকাশ করেছে খোলা চিঠি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদসহ কলেজগুলোর অধ্যক্ষরাও।
মেডিক্যাল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জিপিএ ভিত্তিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছু হটেছেÑ এ বিষয়টিও তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বর্তমান জিপিএ ভিত্তিতে মেধা মূল্যায়ন নিয়ে বির্তক রয়েছে। সেখানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে যদি এই বির্তকিত পদ্ধতিকে মেধা মূল্যায়নের মাপকাঠি ধরা হয় তবে তা বির্তকিত থেকে যাবে। আর কিভাবে হবে তাও যদি অষ্পষ্ট রাখা হয় তাতে অস্থিরতা বাড়তে পারে। শিক্ষাবিদরা ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের চিন্তারও সমালোচনা করেছেন। এ পদ্ধতি চালু করার সময় এখনও আসেনি। পাবলিক পরীক্ষায় গণহারে পাস করছে ঠিকই কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করে ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ করলে অনেক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই বলছে, এবার একাদশ শ্রেণীতে জিপিএ ভিত্তিতে ভর্তিতে যে বিড়ম্বনায় পড়েছিল শিক্ষার্থীরা তাতে সকলের কাছে এ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর এটি যেহেতু উচ্চশিক্ষার ভর্তি সেখানে অবশ্যই মেধার ভিত্তিকে সঠিক মূল্যায়ন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হবে; অন্যথায় আন্দোলন। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা একটি খোলা চিঠিও পাঠিয়েছে উপাচার্যের কাছে। সেখানে তারা বলেছে, যে জিপিএ নিয়ে এখনও বিতর্ক কাটেনি, সে পদ্ধতিতে ভর্তি করানো হলে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। কারণ মেধা ও যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই কেবল এসএসসি ও এইচএসসি একাডেমিক সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে করার সময় এখনও আসেনি।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেছে, শুধু জিপিএ’র ভিত্তিতে ভর্তি করলে মেধার সঠিক মূল্যায়ন কখনই সম্ভব হবে না। কারণ আমরা যারা গ্রামের বা মফস্বলের ছাত্রছাত্রী তারা নানাবিধ সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে শহরের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় অনেকাংশেই পিছিয়ে পড়ি। এর মধ্যে অন্যতম কারণ ভালমানের কলেজ ও শিক্ষকের অভাব ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা।
এদিকে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট করছেন না কর্তৃপক্ষ। ভর্তির দায়িত্বে থাকা অন্যতম কর্মকর্তা ও ডিন অধ্যাপক মোবাশ্বেরা খানম  বলেন, এখনই এটা বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ভর্তির সময় বলা হলেও কিভাবে ভর্তি হবে তা তো কেউ জানতে পারছে না। এ বিষয়টি উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হবে। অপর ডিন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, হ্যাঁ, মানুষ জানতে চায় তবে আমার মনে হয় এখনও ফাইনাল কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। হলে জানানো হবে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর এ বিষয়ে জানান, কোন পদ্ধতিতে হবে তা বিজ্ঞপ্তির সময়ই বলা হবে। তবে যেহেতু কিছু এখনও বলা হয়নি, তাই ধরে নিতে হবে আগের ঘোষণাই এখনও বহাল আছে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

প্রথম শ্রেণির নিচের কর্মকর্তাদের পাসপোর্টে লেখা থাকবে পিজি (পাসপোর্ট গভর্নমেন্ট)।

এস কে দাস: সরকাpassportরি কাজে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে যাবেন, শুধমাত্র তাঁদেরই অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম করা হচ্ছে। বিদেশ ভ্রমণে সরকারি আদেশ (জিও) দেখিয়েই পাসপোর্ট গ্রহন করতে হবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বিদেশ ভ্রমণকারী সরকারি কর্মকর্তঅ-কর্মচারীদের জন্য জিও জারি করবে।সরকার অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়ার নীতিমালায় এ পরিবর্তন আনছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আর এ জন্য অফিশিয়াল পাসপোর্টের প্রাধিকার পুনর্নিধারণ করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, অফিশিয়াল পাসপোর্টের অপব্যবহার, এই পাসপোর্টে বিদেশ গিয়ে ফিরে না আসা এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সাজিয়ে মানব পাচার রোধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থার ফলে অফিশিয়াল পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে।

সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সব মিলে প্রায় ১৩ লাখ। বর্তমানে সরকারি দপ্তরের পিয়ন থেকে শুরু করে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত কর্মকর্তারা অফিশিয়াল পাসপোর্ট পেয়ে থাকেন। সচিবেরা ব্যবহার করেন কূটনৈতিক পাসপোর্ট।

২০১১ সাল থেকে অফিশিয়াল পাসপোর্টের প্রাধিকারের গন্ডি বাড়ানো হয়। অফিশিয়াল পাসপোর্টে প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে যান। এই পাসপোর্টে বিদেশ যাওয়া সহজ। কিন্তু বিদেশে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ দেশে ফেরেন না। অফিশিয়াল পাসপোর্টের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নেই এমন ব্যক্তিরাও অফিশিয়াল পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। এতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা সাজিয়ে “অফিশিয়াল পাসপোর্টে” বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের ঘটনার পর আমরা এ পর্যন্ত কয়েক হাজার পাসপোর্ট বাতিল করেছি। আর বেশ কয়েকটি দেশ থেকে অফিশিয়াল পাসপোর্ট কমানোর অনুরোধ এসেছে। এ কারণে আমরা অফিশিয়াল পাসপোর্টের শ্রেণি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন থেকে গণহারে নয়, জিওর ভিত্তিতে অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়া হবে।

সুত্র জানায়, পরিবর্তিত নীতিমালায় সাধারণ পাসপোর্টকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। সাধারণ জনগণকে সবুজ রঙের যে পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তেমন পাসপোর্টই দেওয়া হবে প্রথম শ্রেণির নিচের কর্মকর্তাদের। তবে তাঁদের পাসপোর্টে লেখা থাকবে পিজি (পাসপোর্ট গভর্নমেন্ট)। অফিশিয়াল পাসপোর্টের নম্বরের আগে লেখা থাকবে ওসি (অফিশিয়াল ক্যাটাগরি)। বর্তমানে অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীরা কেবল জিও নিয়ে বিদেশ যেতে পারেন। কিন্তু নতুন নিয়মে তাঁদের আগে জিও নিতে হবে এবং সেই জিও দেখিয়ে অফিশিয়াল পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।

সচিব থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা লাল রঙের পাসপোর্ট পান। অফিশিয়াল পাসপোর্টের রং নীল। এ ছাড়া অন্যান্য সাধারণ পাসপোর্টের রং সবুজ। প্রাধিকার পুননির্ধারণ করা হলে সরকারি কর্মকর্তাদের দুই ধরনের পাসপোর্ট থাকবে। যাঁরা অফিশিয়াল পাসপোর্টের জন্য প্রাধিকার পাবেন তাঁরা সরকারি সফরের ক্ষেত্রে নীল রঙের অফিশিয়াল পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন। এর বাইরে প্রাধিকার ও নন-প্রাধিকার নির্বিশেষে অন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবুজ রঙের পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন। সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণের জিও পেলে তাঁরা অফিশিয়াল পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য হবেন।

এখন যেসব অফিশিয়াল পাসপোর্ট আছে, প্রাধিকার পুননির্ধারণ হলে সেগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। এ ছাড়া বর্তমানে থাকা অফিশিয়াল পাসপোর্টের অনেকগুলোর মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। বিভিন্ন দেশে থাকা সরকারি কর্মকর্তা যাঁরা এর আওতায় পড়বেন, তাঁদের পাসপোর্টের শ্রেণি পরিবর্তন করতে হবে। অফিশিয়াল পাসপোর্টের নীতিমালা বদলাচ্ছে, সরকারি আদেশ জারি করবে কেবল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ

সম্প্রতি পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বৈঠকে অফিশিয়াল পাসপোর্ট নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অফিশিয়াল পাসপোর্টের অপব্যবহার রোধে শুধু সরকারি কাজে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী বিদেশ যাবেন, তাঁদের জিওর ভিত্তিতে পাসপোর্ট দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখার এতজন অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের বলেন, অফিশিয়াল পাসপোর্টেল গন্ডি যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, অফিশিয়াল পাসপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি বন্ধ করতে হলে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। জিও ও এনওসি (অনাপত্তি সনদ) অফিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলে জালিয়াতির মাধ্যমে অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়া বন্ধ হবে।

অফিশিয়াল পাসপোর্টধারীদের বাংলাদেশের সঙ্গে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ চুক্তি থাকা দেশগুলোতে ভিসা নিয়ে যেতে হয় না। ওই দেশে যাওয়ার পর ভিসা নিতে হয়। বর্তমানে সিঙ্গাপুর, চীন, তুরস্কসহ ১৩টি দেশের সঙ্গে এই চুক্তি রয়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সঙ্গে এ চুক্তি হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। এই চুক্তির সুবিধা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী সাজিয়ে মানব পাচারের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অফিশিয়াল পাসপোর্ট নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিদেশে চলে যাচ্ছেন বিসিএস চিকিৎসকেরা। প্রথমে সিঙ্গাপুরে গিয়ে এমন পাসপোর্টধারীদের বেশির ভাগ অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন, আর দেশে ফিরছেন না। অফিশিয়াল পাসপোর্টে তুরস্কে গিয়েও অন্য দেশে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তুরস্ক থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি, স্পেনে যাওয়া যায়।

সরকারি কর্মকর্তা সাজিয়ে অফিশিয়াল পাসপোর্টে এসব পথে মানব পাচার হয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক সরকারের দেওয়া চিঠিতে কয়েকটি মানব পাচারের ঘটনা প্রকাশ পায়। এরপরই অফিশিয়াল পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। – See more at: http://www.sheershanewsbd.com/2015/07/23/89538#sthash.yic5idLk.dpuf

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং ব্যধির মত

এস কে দাস: উচ্indexচ মাধ্যমিকে ভর্তির অনেক আগেই শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক কোচিং শুরু করতে হয়। এবারও তাই হয়েছে। আগামীতে এই অবস্থা কেটে যাবে, এমনটি মনে করে না কেউই। উল্টো এই বিষয়টি ব্যাধি আকারে ধারণ করে লেখাপড়ার (শিক্ষা ব্যবস্থা) সঙ্গে একাকার হয়ে দিনে দিনে বাড়তেই থাকবে, এমন মন্তব্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। ‘কোচিং না করলে পরীক্ষায় ভাল ফল করা যায় না এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে’- ভাল ফল অর্থ জিপিএ- ৫। তারওপর হালে জিপিএ-৫ হলেই শুধু হবে না সকল বিষয়েই এ- প্লাস পেতে হবে। সকল বিষয়ে এ-প্লাসের একটা অদ্ভুত নামকরণ হয়েছে গোল্ডেন এ- প্লাস। এই ‘গোল্ডেন’ শব্দ বা পরিভাষাটি শিক্ষা বিভাগে এবং কোন বোর্ডেই নেই। কী করে যে তা আপন গতিতেই যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশ করেছে তা কেউ বলতে পারে না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে ছড়িয়েছে যে কোচিং না করলে এই গোল্ডেন পাওয়া সহজ নয়। আবার এই গোল্ডেন (প্রতিটি বিষয়ে ৮০ থেকে ১শ’ নম্বর) পেলেই যে পছন্দের ভাল কলেজে ভর্তি হওয়া যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই। যেমন এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা বিভাগ উত্তীর্ণ সকল শিক্ষার্থীকে অনলাইনে ফরম পূরণ করার নির্দেশ দেয়। সকলকেই পছন্দের ক্রমানুসারে পাঁচটি কলেজের নাম নির্বাচন করতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠিত ভাল কলজেগুলো বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে ভর্তির জন্য ন্যূনতম যোগ্যতার ঘোষণা দেয়। সেই অনুযায়ী কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করা থাকে। যেমন ঢাকা কলেজসহ দেশের প্রতিষ্ঠিত কলেজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির জন্য সর্বনিম্ন জিপিএ-৫ চেয়েছে। অনলাইনে আবেদন করার সময় কেউ যদি জিপিএ-৫ না পেয়ে প্রথম পছন্দে ঢাকা কলেজ টিক দেয় তা কম্পিউটার নেবে না। এই অবস্থায় ভাল কলেজে পড়তে চাইলে ফল জিপিএ-৫ হতেই হবে। এমনও হয়েছে জিপিএ-৫ ‘গোল্ডেন’ পেয়েও পছন্দের ভাল কলেজে ভর্তির সুযোগ মেলেনি। নির্ধারিত ভর্তির আসনপ্রাপ্ত নম্বরের ওপর ভিত্তি করে পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ জিপিএ-৫ ফলে সকল বিষয়ে মোট নম্বর আসন পূরণে ওপর থেকে নিচ যে পর্যন্ত ঠেকেছে সেই পর্যন্তই প্রথম পছন্দের কলেজ নিয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তৃতীয়…পছন্দে চলে গেছে। এভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে কোচিং অনেকটাই বাধ্যতামূলক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন শিক্ষার্থীরাই অভিভাবকদের সরাসরি বলে কোন কোন বিষয়ে কোচিং নিতে হবে। মা-বাবা অভিভাবকদের বোঝাতে সক্ষম হয় তাদের সহপাঠীরা যখন কোচিং করে লেখাপড়ায় এগিয়ে যাচ্ছে তখন সে পিছিয়ে থাকবে কেন। মা-বাবাও এই বিষয়টি মেনে নিতে বাধ্য হন এবং কোচিংয়ের বাড়তি খরচ যোগাতে থাকেন। কারণ চারদিকে শিক্ষার অবস্থা দেখে চোখ-কান মেলে তারা বুঝতে পারছেন সন্তানের লেখাপড়ার গতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা থাকার কথা সম্ভবত তা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পড়তে ও পড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন। অনেক সময় নির্দিষ্ট কোচিং সেন্টারের নামও বলে দেন। এসব কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তাদের অদৃশ্য সম্পর্ক আছে বলে জানা যায়। এই বিষয়ে এক অভিভাবক বললেন, বর্তমানে এক শ্রেণীর চিকিৎসক যেমন রোগ নির্ণয়ের আগে শরীরের যাবতীয় পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠায় শিক্ষা ব্যবস্থাতেও কোচিং তেমনই এক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাধি দূর হওয়ার কোন উপায় তারা দেখতে পান না। বরং মহামারির মতো জেঁকে বসেছে। এই বছর মাধ্যমিকে সকল বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া তন্দ্রা, পৃথ্বা ও সূচি বলল, পরীক্ষা শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরই পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যায় কোচিং শুরু করেছে তারা। ওই সময়ে কোচিং শুরু করতে না পারলে ভাল কোচিং দেন এমন শিক্ষকের কাছে আসন পাওয়া যেত না। কোচিংয়ের অবস্থাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে যেখানে ভাল কোচিং হয় সেখানেও দিনের কয়েকটি ব্যাচে আসনসংখ্যা সীমিত করা আছে। কোচিং প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক সাফ বললেন, ভাল কোচিং পেতে ভাল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তিনি দাবি করলেন সীমিত শিক্ষার্থী নিয়ে কোচিংয়ে ভাল পাঠ দেন এবং শিক্ষার্থীরা ভাল ফল করে। রাজধানী ঢাকায় শিক্ষায় কোচিং পাঠ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে সকল জেলা শহর বর্তমানে উপজেলা সদরেও কোচিং যেন শিক্ষা কার্যক্রমের বড় অংশ হয়ে গেছে। ঢাকার অনেক কোচিং প্রতিষ্ঠানের শাখা বড় জেলা শহরগুলোতে স্থাপিত হয়েছে। ঢাকার বাইরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বিষয়ভিত্তিক কোচিং জনপ্রতি প্রতি ব্যাচে ৫শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা (কখনও আরও বেশি) করে দিতে হয়। কোন বিষয়ের শিক্ষক ৬ মাসের একটি প্যাকেজের জন্য নেন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এই টাকা দু’তিন মাস অন্তর কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে সকল বিষয়েই কোচিং করতে হয়। বাংলা ও ইংরেজী বিষয়েও কোচিং এখন শুরু হয়েছে। নতুন বিষয় তথ্যপ্রযুক্তিতে কোচিং নিতে হবে এমনটিও জানানো হয়েছে। ঢাকা মহানগরীতে কোচিং ফি অনেক বেশি। মোট কথা কোচিং ছাড়া আজকাল কোন পাঠ নেই। স্কুলে ও কলেজে যে পাঠদান করা হয় তা কার্যত নামে মাত্র। পরীক্ষায় ভাল ফলের জন্য প্রাথমিক স্কুলে ভর্ত্তির পর হতেই কোচিং শুরু হয়ে যায়। প্রাথমিক পাঠ উত্তীর্ণ হয়ে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির পর বিষয়ভিত্তিক যে কোচিং শুরু হয় তার রেশ চলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। উচ্চ মাধ্যমিকের পর মেডিক্যাল ও প্রকৌশল পাঠের জন্য নির্ধারিত সময়ের প্যাকেজে যে কোচিং শুরু হয় দেশজুড়ে তার বহু প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে। হালে প্রতিটি কোচিং সেন্টারের বাহারি ব্রুশিয়ারগুলোতে কে, কবে পাঠ নিয়ে কোথায় ভর্তি হয়েছে তার ফিরিস্তি দেয়া হয়। জেলা শহরগুলোতে কোচিংয়ের সফলতার প্রচার প্যানাপ্লেক্স ইলেকট্রিক পোলের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে ভাল স্কুল ও কলেজে ভর্তি হওয়ার মূল লক্ষ্য হলো সার্টিফিকেটে ডিগনিফায়েড একটি স্কুলে বা কলেজের পরিচিতি থাকা। কয়েক অভিভাবক বললেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের সঙ্গে মা-বাবাকেও পরোক্ষ কোািচং করতে হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে কোচিংয়ে পৌঁছে দেয়া এবং সেখান থেকে আনার দায়িত্ব পালন করতে হয় অভিভাবকদেরই। শিক্ষার্থীদের স্কুল ও কলেজে থেকে বাড়িতে গিয়ে দুইদ- না বসতেই দৌড়াতে হয় কোচিংয়ে। সকাল থেকে শুরু করে স্কুল কলেজ ও কোচিং শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে পাঠে মনোযোগী হতে হয়। এই অবস্থা চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। ভাল শিক্ষার্থীদের অনেক রাত পর্যন্ত পড়ার টেবিলে বসতে হয়। এসব শিক্ষার্থীর শরীরের ক্যালরি পূরণেও ভাল খাবার দিতে হয়। বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থার এই হাল দেখে কয়েক প্রবীণ তাদের কালের কথা স্মৃতি চারণ করলেনÑ গত শতকে ষাটের দশকের প্রথমার্ধে তারা মাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। ১৯৬২ সালের আগে মাধ্যমিক পরীক্ষার পরিচিতি ছিল এন্ট্রান্স পাস। বোর্ড ছিল একটি ঢাকা। এরপর কয়েকটি বোর্ড স্থাপিত হয়। স্কুল ও কলেজে কোচিং বলতে বোঝানো হতো প্রাইভেট পড়ানো। পরীক্ষায় অতিরিক্ত ভাল ফলের (বোর্ডে স্ট্যান্ড লেটার মার্ক স্টার মার্ক প্রথম ডিভিশন) জন্য মেধাবীরা কেউ প্রাইভেট পড়ত। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজে শিক্ষকরা ক্লাসে যে পাঠ দিতেন তার ওপর ভিত্তি করে মেধাবী ও মধ্যম গোছের শিক্ষার্থীরা কখনও কোন স্যারের কাছ থেকে কখনও লাইব্রেরীতে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক বই ঘেঁটে নোট লিখে পাঠ্যক্রমকে সমৃদ্ধ করা হতো। গত শতকে ’৭০-এর দশকেও স্কুল ও কলেজে বড় জোর প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টি ছিল। ’৯০-এর দশকের শুরু থেকে একটু একটু করে সেই যে কোচিংয়ের অধ্যায় শুরু হয়ে গেল তা আর থেমে থাকেনি। দিনে দিনে কোচিংয়ের শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোচিং যেন ‘আবশ্যিক বিষয়’ হয়ে গেছে। একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো- বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থা আপাতত দৃষ্টিতে অনেক উন্নত। নতুন অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী। বিশেষ করে প্রযুক্তি ছাড়া এখন চলার কোন উপায় নেই। মেধার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় না থাকলে প্রজন্মের আগামী দিনে এগিয়ে চলা বেশ কঠিন। তারপরও যে বিষয়টি আসে তা হলো- বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য (ব্যবসা শিক্ষা) বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগে বিষয়ভিত্তিক পাঠ ছাড়া বর্তমানের শিক্ষার্থীরা অন্য কোন বিষয় নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। একটা সময় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক্সট্রা কারিকুলাম এ্যাক্টিভিটিজ দেখা হতো। অর্থাৎ সংস্কৃতির পরিম-লে কার কী অবস্থান তা পরিমাপ করে সেই ভাবেই তাকে গড়ে তোলা হতো। যেমন যে ভাল খেলাধুলা করে, স্পোর্টসে যে ভাল তাকে মাঠে প্রাকটিস করতে হতো। গান, নাটক, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক, গল্প বলা, কল্পনা শক্তির পরীক্ষা (ইমাজিনেশন পাওয়ার) ইত্যাদি বিষয় দেখা হতো। এ জন্য নির্ধারিত ক্লাস রুটিনের শেষে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। প্রতিটি স্কুল ও কলেজে খেলার মাঠ ছিল ম্যান্ডেটরি। মাঠ ছাড়া কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বই পড়াকে (যে কোন ধরনের বই) এতটাই উৎসাহিত করা হতো যে ক্লাসের বইয়ের বাইরে কে, কী বই পাঠ করেছে তা শোনা হতো। নবম ও দশম শ্রেণীর ক্লাস শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনতেন একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি কে, কত বেশি পড়েছে। অনেক সময় যে বেশি বই পড়েছে তার কাছ থেকে তার বিষয় শুনে এবং বিশ্লেষণের ক্ষমতা পরখ করে বাড়তি নম্বর দিতেন। মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রমাণ পেলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার ওপর বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষকদের বলে দিতেন যেন বাড়তি পাঠ দেয়া এবং বাড়তি ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাড়তি ক্লাস নিতেন যাতে তারা ভালভাবে বুঝতে পারে। এভাবেই একটা সময় শিক্ষার্থীরা নিজেদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমানে কোচিং ছাড়া যেন কিছুই ভাবতে পারছে না শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

জাহাঙ্গীরনগরের একজন জাহাঙ্গীরের গল্প

লাবনী আক্তার: এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জাহাঙ্গীরনগরের এক জাহাঙ্গীরের গল্প। জীবনের বিচিত্রতার মাঝেও মানুষ যে নিজেকে সমাজের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারে এটি তারই গল্প, নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার গল্প, মাথা তুলে বাঁচতে ja-300x400পারার গল্প। হ্যাঁ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনই এক জাহাঙ্গীর আছেন যিনি শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় সারা বাংলাদেশের গর্ব। আসুন শুনে নিই তার ছোট্ট জীবনের ছোট্ট গল্প।

সাদামাটা পরিচয়ে বলা যায় জাহাঙ্গীরনগরের ট্রান্সপোর্ট চত্ত্বরে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানে চা বিক্রি করেন জাহাঙ্গীরের মা। বিকেলে জাহাঙ্গীরের মায়ের চায়ের দোকানে বসে ছাত্রছাত্রীদের আড্ডা, আর তার ফাঁকে চলে চা খাওয়ার আসর। এরই মাঝে বড় হয় জাহাঙ্গীর। কিন্তু সমাজের কাছে বঞ্চিত আর দশটা ছেলের মত জাহাঙ্গীর এখন আর নেই। এখন সে শুধু ট্রান্সপোর্টের গরীব চা ওয়ালা খালার ছেলেই না, এখন সে জাহাঙ্গীরনগরের অনেক ছাত্রছাত্রীর সহপাঠী, বন্ধু।

অবাক হচ্ছেন? সকল না পারা আর বাঁধাকে অতিক্রম করে জাহাঙ্গীর এখন নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে। মাথা তুলে বেঁচে থাকার পথ অনুসরণ করছে। এখন খুব কম ছাত্রছাত্রীই তাকে বলে যে, ‘জাহাঙ্গীর এক কাপ চা দাও তো’, বরং তারা বলে ‘জাহাঙ্গীর ক্লাসের সময় হয়ে গেল চল ক্লাসে যাই’।

জাহাঙ্গীর যখন ১ বছর বয়সের ছিল তখন তার বাবা আতর আলী হবিগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে জাহাঙ্গীরনগরে আসেন। ছোট্ট একটা চায়ের দোকান দিয়ে সংসার পরিচালনা করেন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার বাবা চলে যান না ফেরার দেশে। এরপরে সংসারের হাল ধরেন তার মা, ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় খালা। ছোট্ট চায়ের দোকানটি চালিয়েই জাহাঙ্গীরের মা সংসার চালান, পাশাপাশি জাহাঙ্গীরকে পড়াশোনা করান। জাহাঙ্গীরেরও পড়ার প্রতি ছিল বেশ আগ্রহ, বুকের মাঝে লুকিয়ে ছিল কিছু স্বপ্ন যেগুলো আজ একে একে পূরণ হয়ে চলেছে। জাহাঙ্গীর ডেইরি ফার্ম স্কুল থেকে এসএসসি এবং বিপিএটিসি স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে। এখন সে জাহাঙ্গীরনগরের দর্শন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র।

৪ ভাইবোনের মধ্যে জাহাঙ্গীর একাই ভাই। বড় ২ বোনের বিয়ে হয়েছে, আর ছোট্ট একটি বোন আছে। সপরিবারে জাহাঙ্গীর এখন ক্যাম্পাসের পাশেই ইসলামনগরে থাকে। ক্লাসের ফাঁকে বিকেল বেলাতে মায়ের সাথে কিছুটা সময় দোকানে বসে আর সন্ধ্যে হলে বাড়ি ফিরে পড়তে বসে।

জাহাঙ্গীর বাংলাদেশের গর্ব। দুর্বল আর নিপীড়িতদের অগ্রপথিক। জাহাঙ্গীর মাথা নিচু করে বাঁচতে জানে না। তাই সংগ্রাম করে নিজের যোগ্যতায় ছিনিয়ে নিয়েছে সমাজে বেঁেচ থাকার সমস্ত অধিকার। আর এই বীরসৈনিকের যোগ্যতার প্রমাণে সে পরিণত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগরবাসীর প্রিয় পাত্রে, ভালোবাসার মানুষে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মাননীয় তথ্যমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

গোলাম মাওলা রনি সাবেক সংসদ সদস্য:

প্রিয় ইনু ভাইÑ সালাম ও শুভেচ্ছা। আপনাকে মাননীয় মন্ত্রী বলে সম্বোধন করলাম না। কারণ ইনু ভাইই আমার কাছে অধিক প্রিয় এবং সম্ভবত সারা বাংলাদেশে অধিক পরিচিত। কত মন্ত্রী এলো গেল, আর এমপিদের কথা তো বাদই দিলাম; বাংলার জনগণ ক’জনকেই বা চেনে! কিন্তু আমার ইনু ভাই! মাশাআল্লাহ বাংলাদেশের সবাই চেনে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং ঝিনাইদহ থেকে দৌলতদিয়া কিংবা সুন্দরবন থেকে বান্দরবানÑ কে না চেনে আপনাকে! আমার দলের কিছু হাঁদারাম আপনার ওজন বুঝতে পারে না। আপনার অকুতোভয় সংগ্রাম সে দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আপনার আহ্বানে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী সে দিন প্রবল প্রতাপশালী বঙ্গবন্ধু সরকার এবং তার দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে আপনি এক সময় অনেকটা বাধ্য হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবে রূপ দিলেন। হাজার হাজার তরুণ যোদ্ধা অকুতোভয়ে অস্ত্র হাতে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে দিনের রক্ষীবাহিনী এবং পুলিশের হাতে আপনার প্রাণপ্রিয় ২০ হাজার ছেলে মারা গিয়েছিল। আর কারারুদ্ধ হয়েছিল আরো অনেক বেশি।
বঙ্গবন্ধু সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেও আপনার সাথে পেরে উঠছিল না। আপনি জনমতকে প্রভাবিত করার জন্য বের করলেন জাতীয় দৈনিক গণকণ্ঠ। ওই সময় গণকণ্ঠের যে জনপ্রিয়তা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে আজ অবধি কোনো পত্রিকা অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। আপনার নেতৃত্বে পরিচালিত জাসদের সামরিক শাখা গণবাহিনীতে যেভাবে আত্মাহুতি দেয়ার জন্য মেধাবী তরুণেরা ঝাঁপিয়ে পড়ত, সেভাবে অন্য কোনো সংগঠন আজ পর্যন্ত কাউকে আকর্ষণ করতে পারেনিÑ এমনকি আলকায়েদা বা তালেবানেরাও নয়। মানুষকে সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব মোল্লা ওমর বা ওসামা বিন লাদেনের চেয়েও বেশি। কারণ ওসামা দু’হাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করে আলকায়েদা যোদ্ধাদেরকে সুসংগঠিত রাখতেন। আর মোল্লা ওমর দিতেন গণিমতের মাল। অন্য দিকে আপনি দিতেন কেবল আদর্শিক মন্ত্র। আপনিই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র সফল নেতা, যিনি একজন বেসামরিক ব্যক্তি হয়েও সফলভাবে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়ে ৭ নভেম্বরের মতো যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
বঙ্গবন্ধু সরকার যেমন জাসদ গণবাহিণীকে মেনে নিতে পারেনি, তেমনি পারেনি ওই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক গণকণ্ঠের প্রচার ও প্রসারকে। এক সময় গণকণ্ঠ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং আপনার নিয়োগ করা সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার দিন আপনি হয়তো খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। আমার বিশ্বাস ওই ঘটনা স্মরণ করলে আজো আপনার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আর এ কারণেই বাংলাদেশের নির্যাতিত সাংবাদিক-সম্পাদক-সংবাদপত্র আপনাকে মনে করে তাদের মর্মব্যথী অভিভাবক। যেসব সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেল বন্ধ হয়ে আছে, তারা দৈনিক গণকণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আপনার কাছে হররোজ রুহানিভাবে আবেদন-নিবেদন পেশ করছে। আপনি কি তা শুনতে পাচ্ছেন? বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকানাধীন যমুনা টিভি বহু দিন ধরে আটকে ছিল। টিভিটির মালিক শত কোটি টাকা খরচ করেও কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না; কিন্তু যেই না আপনি মন্ত্রী হলেন অমনি তাদের শত সমস্যার বরফের পাহাড় রাতারাতি গলে গেল। এ নিয়ে সাংবাদিকসমাজ বেজায় খুশি।
এই মুহূর্তে আপনাকে মনে করা হয় সরকারের মুখপাত্র। আওয়ামী লীগ সরকারে আপনার প্রভাব এবং প্রতিপত্তি যেকোনো দলীয় মন্ত্রীর চেয়ে বহুগুণে বেশি। আর এ নিয়ে দলের মধ্যে সকাল-বিকেল কানাঘুষা হয় বটে, কিন্তু আখেরে তারা আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ জন্মগতভাবেই আপনি মেধাবী এবং অভিজাত বংশের সন্তান। আপনার স্বর্গীয় বাবা পাকিস্তান আমলে একটি বড় সরকারি করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। আপনি ১৯৭০ সালে বুয়েট থেকে পাস করা ইঞ্জিনিয়ার। স্বাধীনতার পর সম্পূর্ণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মেরুদণ্ড নিয়ে কেবল আপনিই আজ অবধি সরবÑ অন্যরা সব মরে গেছে, নয়তো হতাশার সাগরে ডুব দিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। রাজনীতির বাইরে আপনার বন্ধুবাৎসল্য রীতিমতো আলোচনার বিষয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও হাসানুল হক ইনুর হরিহর আত্মার বন্ধুত্বের খবর এ দেশের রাজনীতির মানুষের অজানা নয়। আমি এত্তসব বললাম আমার দলের তালপাতার সেপাইদেরকে বোঝানোর জন্য, যারা আপনার সম্পর্কে না জেনেই মন্তব্য করেন। কেউ একজন সে দিন আপনার নাম ধরে বলছিল, এবার আর তার রক্ষে নেইÑ নাসিম ভাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হচ্ছেন। আমি বললাম, তাতে কী? লোকটি বললÑ আরে জানেন না, তার নেতৃত্বে জাসদ গণবাহিনীর লোকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় আগুন দিয়েছিল আর তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাসিম সাহেবের বাবা ক্যাপ্টেন মনসুর। সে দিনকার বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাসুম ছেলেমেয়েরা নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছিলেন। নাসিম সাহেব নাকি সেই দুঃসহ স্মৃতি মনে করলে এখনো বিুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং সময় ও সুযোগ পেলে সেই ঘটনার একটা বিহিত করে ছাড়বেন। আমি লোকটিকে বললাম, তা গত টার্মেও তো তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আর ইনু সাহেব তো কিছুই ছিলেন নাÑ তখন করেননি কেন। অন্য দিকে এবার তো ইনু সাহেব নাসিম সাহেবদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান। তা ছাড়া যে মানুষটি কারো বাবাকে নাস্তানাবুদ করার ক্ষমতা রাখে, তার পক্ষে নাস্তানাবুদ লোকটির ছেলেসন্তানকে অধিকতর নাকানি-চুবানি খাওয়ানো ব্যাপারই নয়।
আমার দলে যে যা-ই বলুক না কেন, আমি কিন্তু আপনাকে একজন যোগ্যতম মানুষ হিসেবেই জানি। ১৯৯০ সালের দিকে কাঁটাবনের ঢালে একটি বিল্ডিংয়ের নিচতলায় যখন আপনি থাকতেন, তখন একদিন ইঠাৎ করেই আপনার বাসায় গিয়েছিলাম ভাবীর সাথে কথা বলার জন্য। সে এক অন্য কাহিনী। আমাদের রিনা ভাবীর মতো এমন সুযোগ্য স্ত্রী কয়জন রাজনীতিবিদের কপালেই বা জোটে। ভাবী ছিলেন আপনার রাজনীতির মাঠের সতীর্থ এবং সেই থেকে আজ অবধি একইভাবে আছেন। ’৭০-এর দশকে আপনাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল ভারতীয় আগ্রাসন। কর্নেল তাহের, মেজর জলিল, সিরাজুল আলম খান এবং আপনি যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে আবারো অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, তার মূলে ছিল সর্বক্ষেত্রে ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
দিন বদলে গেছে। রাজনীতি আর আগের মতো নেই। ভারতও আগের মতো আগ্রাসনের হুমকি দিচ্ছে না। আর তাই আপনাদেরও দরকার পড়ছে না অস্ত্র হাতে লড়াই করার। তাই তো শান্তির সময়ে জুলিওকুরি পুরস্কারের ধারক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দলটির সাথে আপনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। আপনার প্রবল প্রতিপত্তি, মেধা, সামরিক রণকৌশল, উন্নত বাচনভঙ্গি জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে করেছে শক্তিশালী। তার শাসনব্যবস্থাকে করেছে মহীয়ান ও গরীয়ান। আজ যদি বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেন, তবে জননেত্রীর সাফল্য দেখে বলতেনÑ এ-ও কি সম্ভব! এ আমি কী দেখছি! কবিগুরু দেখে যানÑ আমার ইনু, আমার বাদল আমাকে জাতির পিতা বলছে! জয় বাংলা এবং জয় বঙ্গবন্ধু বলছে এবং আমার দলের মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য রাখছে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, তারা আপনার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে খুবই খুশি। কারণ আমাদের দলের বেশির ভাগ নেতাই এখন আর নেতৃত্ব দেয়ার পর্যায়ে নেই। তাই অন্তরের অন্তস্তল থেকে আপনাকে জানাই লাল সালাম। আমাদের রাজনীতির মাঠের সব ফুল ও ফল আপনার শোভা বর্ধন করুক, এই প্রার্থনা করে মূল প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি।
আমার ইনু ভাইÑ আমি এতক্ষণ যে কথা বললাম, তা আমার আসল কথা নয়। আমি যে কথাটি বলব, তা যে আপনি করতে চান এবং করতে পারেন সেটি বোঝানোর জন্যই এতক্ষণ আপনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সামান্য আলোচনা করলাম। কোনো ভুল যদি হয়ে থাকে তবে আপন গুণে ক্ষমা করে দেবেন, এই আশা নিয়ে আগে বাড়ছি। আপনি যে মন্ত্রণালয়টির অধিকর্তা, সেই মন্ত্রণালয়ের অধীনেই বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্প কাজ করে যাচ্ছে। তারা ভারতীয় টিভিগুলোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না। উল্টো বহুমুখী হয়রানির শিক্ষার হচ্ছে। বাংলার আকাশ এখন মূলত ভারতীয় টিভির দখলে। বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় সংস্কৃতির কুপ্রভাব। পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছেÑ সমাজের সর্বস্তরে শুরু হচ্ছে নৈতিক অধঃপতন। হু হু করে বাড়ছে হিন্দি স্টাইলে অপরাধ। মাদকের ব্যবহার ও বিকৃত যৌনাচার। আমরা সর্বনাশা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, এ দেশে কবে না জানি ধর্ষণকে শিল্পের মর্যাদা দেয়া হয়।
আপনার তপ্ত যৌবনে অস্ত্র হাতে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্নের দোহাই দিয়ে বলছিÑ আপনি আপনার ক্ষমতা প্রয়োগ করুন এবং ভারতীয় টিভিগুলোর অশ্লীল সম্প্রচার বন্ধ করুন। আমি আপনাকে ভারতীয় চ্যানেলের কিছু কুপ্রভাবের বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি হয়তো আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমার বিশ্বাস, প্রচণ্ড ব্যস্ততা এবং সময়ের অভাবে আপনি হয়তো অনেক চ্যানেলের অনেক অনুষ্ঠান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পান না। আবার এই অনুষ্ঠানের প্রভাবে আমাদের আবহমান বাংলার শহর, বন্দর, জনপদে বা গ্রাম-গ্রামান্তরে কী কী বিষবাষ্প ছড়াল তা হয়তো লক্ষ করার সুযোগ আপনি পাননি। তাই আজকের খোলা চিঠির মাধ্যমে আপনাকে কিছু নির্মম বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিতে চেষ্টা করব।
আজ আমাদের বালক-বালিকারা মাতৃভাষার পরিবর্তে হিন্দিতে কথা বলছে। কিশোর-কিশোরীরা লেখা পড়া বাদ দিয়ে প্রেম করার জন্য উথালপাথাল করছে। তরুণ-তরুণীরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে সারা দিন কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। আবার এসব সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে ক্ষণস্থায়ী হচ্ছে অনৈতিকতার কারণে। সকালে এক প্রেমিক তো বিকেলে আরেকজন। অন্য দিকে ছেলেরা তো আরো একধাপ এগিয়ে তাদের বান্ধবী বা প্রেমিকাদের গলগ্রহ হয়ে পড়ছে। তারা মেয়েদেরকে প্রলুব্ধ করছে তাদের ব্যয় নির্বাহের জন্য। কোমলমতি মেয়েরা প্রায়ই পরিবার থেকে টাকা চুরি করে তাদের প্রেমিক প্রবরের হাতে তুলে দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছে, একটি ছেলেকে নিয়ে একাধিক মেয়ে কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। অন্য দিকে একটি মেয়েকে নিয়ে একাধিক ছেলের বন্য লড়াই তো আদিমকালেও ছিলÑ তবে সাম্প্রতিককালে তা সীমা অতিক্রম করেছে।
সমবয়সী ছেলে-মেয়েদের অনৈতিক সম্পর্কের বাইরে যে জিনিসটি আমাদের সমাজের নতুন ক্যান্সার হিসেবে দেখা দিয়েছে, তা হলো অসমবয়সীদের অনৈতিক সম্পর্ক। গ্রামের একটি মেয়ে কিংবা শহরের একটি নি¤œবৃত্ত পরিবারের মেয়ে অনায়াসেই অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে তার বাপ-চাচার বয়সী ধনাঢ্য কোনো লোকের সাথে। জৈবিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মোটা অঙ্কের মাসোয়ারার জন্য তারা এসব কাজ করছে। আর এসব নোংরা বিষয় নিয়ে তাদের কোনো লজ্জা বা হায়া নেই। অনেকে বরং গর্ব করে তাদের কীর্তিকলাপের রগরগে কাহিনী বান্ধবীদেরকে বলে বেড়ায়। ফলে ভাইরাসের মতো এই সামাজিক ব্যাধিটি দিনকে দিন সমাজকে গ্রাস করছে। ছেলেরাও পিছিয়ে নেই। তারাও খুঁজে বেড়ায় ধনাঢ্য বয়সী মহিলাদের এবং পেয়েও যায়। সম্পর্ক স্থাপন করার পর তারা ঢং করে ডাকে আন্টি। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় তারা থাকে নিরাপদ। একজন বয়স্ক পুরুষের সাথে কিশোরী মেয়েদের দেখলে সমাজ সহজেই সন্দেহ করে বসে। অন্য দিকে আন্টির সাথে কোনো কলেজপড়–য়া তরুণকে দেখলে তুলনামূলক সন্দেহ হয় কম।
তরুণ-তরুণীদের বাইরে প্রাপ্তবয়স্ক দম্পতিদের দাম্পত্যজীবন কলুষিত হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। সোজা বাংলায় একে বলা হয় পরকীয়া। বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’র আদলে এখন আর পরকীয়া হয় না। এখন যা হয় তার অনৈতিকতার স্তর এত নিচে যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। জাহান্নামের বর্ণনায় বর্তমান জমানার কিছু দৃশ্য আপনি পেয়েও যেতে পারেন। বর্ণিত আছে, কিয়ামতের ময়দানে জেনাকার, ব্যভিচারী পুরুষ-মহিলার সংখ্যা হবে সব গুনাহগারের তুলনায় বেশি। এসব নারী-পুরুষের লজ্জাস্থান থেকে এক ধরনের রক্ত মিশ্রিত পুঁজ বের হতে থাকবে। আর সেই পুঁজ রক্তের পরিমাণ এত বেশি হবে যে, সেখান দিয়ে দূষিত পদার্থের একটি নদী বয়ে যাবে। আমাদের সমাজের গ্রামবাংলায় ব্রিটিশ আমলে এ রকম কিছু কিছু ঘটনা ছিল বলে নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী তার বাঙালি জীবনে রমণী বইতে বিস্তারিত লিখেছেন; কিন্তু শহুরে শ্রেণীর মধ্যে এই অপরাধ ছিল খুবই কম। তবে সাত-আট বছর ধরে পরকীয়ার মারণব্যাধি মহামারী আকারে সমাজকে গ্রাস করছে।
হরেকরকম যৌন সম্পর্কের বাইরে ইদানীং বেড়ে যাচ্ছে ধর্ষণ। আর পরিবারের অভ্যন্তরে বাড়ছে পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, হানাহানি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। কেউ কাউকে মর্যাদা দিচ্ছে না, আবার কেউ কারো প্রতি নির্ভরও করতে পারছে না। ফলে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এখন সারা দেশে একান্নবর্তী পরিবার নেই বললেই চলে। শুধু ঢাকা শহরেই লাখ লাখ পরিবার রয়েছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানেরা ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ছাদের নিচে বাস করে। সমাজ থেকে মায়া-দয়া উঠে যাচ্ছে। শ্রদ্ধাবোধ, গুণীজনকে সম্মান, মুরব্বিদের সমীহ করাÑ এসব এখন কেতাবি ভাষা। হু হু করে বাড়ছে অপরাধ। কথায় কথায় একজন আরেকজনকে মারছে। দরকার পড়লে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। আমানতের খেয়ানত করছে এবং অন্যের পরিশ্রমলব্ধ অর্থ জোর করে দখল, লুট বা চুরি করার প্রবণতা বাড়ছে। আর এসব কর্মকারী তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা তো দূরের কথা, বরং নিজেরদের গর্বিত বলে মনে করছে।
এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, এতসব সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক অধঃপতনের জন্য ভারতীয় টিভিগুলো দায়ী হলো কেন। এই প্রশ্নের জবাব জানার জন্য আপনি যেকোনো দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টিভির সামনে বসুন। রিমোট হাতে নিয়ে স্টার প্লাস, স্টার জলসা, জি বাংলা, সনি, এমটিভি, জিটিভি প্রভৃতি দেখতে থাকুন। আপনি যদি ওদের প্রচারিত সিরিয়ালগুলো দেখেন, তবে প্রথমেই আপনার নজরে আসবে মহিলাদের কুটনামি সম্পর্কে। কিভাবে বউ শাশুড়িকে পরাজিত করবে বা কিভাবে ননদ, জা, দেবর, শ্বশুর, স্বামী, নিজের গর্ভজাত ছেলেমেয়ে, কাজের লোক, অফিসের সহকর্মী প্রমুখের সাথে কুটনামি করতে হয় তা আপনাকে শিখিয়ে ছাড়বে। আপনি যদি পরপর দু-তিন দিন দেখতে থাকেন, তবে আপনার নফসে আম্মারা আপনাকে ওই টিভি চ্যানেলগুলোর সেবাদাস বানিয়ে ছাড়বে। আপনার খাওয়াদাওয়া, প্রাকৃতিক কর্মাদি এবং নিদ্রা সব কিছুই আপনি প্রণতি দিতে থাকবেন ওইসব অনুষ্ঠানের জন্য। এরপর প্রকৃতির নিয়মে আপনি যা দেখছেন তা বিশ্বাস করতে থাকবেন। বিশ্বাসের ওপর ভালোবাসা জন্ম নেবে এবং এক সময় আপনার ভালোবাসার বস্তুগুলো রোপণ করার জন্য আপনি উঠেপড়ে লাগবেন।
কুটনামি থেকে আপনি চলে যাবেন পরকীয়ায়। রগরগে সব কাহিনী দেখার পর আপনার জিভে পানি চলে আসবে। কিভাবে দেবর ভাবীর সাথে, পুত্রবধূ শ্বশুরের সাথে, শালিকা দুলাভাইয়ের সাথে, গৃহকর্তা কাজের লোকের সাথে, গৃহকর্তী পিয়ন-ড্রাইভার-দারোয়ানের সাথে পরকীয়ার নামে অবাধ যৌনাচার করে একেকটা বাড়ি বেশ্যালয়ে পরিণত করে ফেলছে তার বাস্তব চিত্র দেখতে পাবেন। আগেকার দিনে অনৈতিক সম্পর্কের কোনো দৃশ্য চিত্রায়িত বা অভিনীত হলে শেষ পরিণতি দেখানো হতো নীতি-নৈতিকতার পক্ষে। অনৈতিক সম্পর্কের পাত্রপাত্রীরা হয় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হতো, নয়তো নির্ঘাত কোনো অপঘাতে মারা যেত। মাঝে মধ্যে সামাজিক বিচার বা কোর্ট-কাচারির বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তি দেয়া হতো; কিন্তু ইদানীং সব কিছু দেখানো হচ্ছে উল্টোভাবে। এখানে অনৈতিক কাজের নায়ক-নায়িকাদের গগনচুম্বী সফলতা আপনাকে মন্দ কাজের দিকে অবশ্যই প্রলুব্ধ করবে। এরাই ভালো ব্যবসায় করছে। সুন্দর বাড়িতে থাকছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করছে এবং জনগণের নেতা হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা বলুন তো, আপনি কি এসব কাণ্ডকারখানা বরদাশত করতে পারবেন? দোহাই আপনার! খুব ভালো করে চিন্তা করুন এবং আপনার মনমানসিকতা আমাদের জানান।
এরপর আপনি কিশোর-কিশোরীদের নষ্টামিমূলক সিরিয়াল দেখতে থাকুন এবং নিজের ১৩-১৪ বছরের সন্তানসন্ততি কিংবা আত্মীয়পরিজনের কথা ভাবতে থাকুন। কিশোর-কিশোরীরা প্রথমত, এমনভাবে পোশাক পরে যাতে করে তাদের শরীরের গোপন অঙ্গগুলোর ভাঁজ এবং অবস্থান আপনি সহজেই দেখতে এবং বুঝতে পারেন। এরা প্রায়ই নিতম্ব দুলিয়ে আপনাকে আকর্ষণ করবে। কখনো দুই পা ফাঁক করে এমনভাবে নাড়াতে থাকবে যাতে আপনার দৃষ্টি, মন ও চিন্তা বিশ্বলোক থেকে ছুটে এসে ত্রিভুজের অস্তিত্বে বিলীন হতে চাইবে। তারা বুক দুলিয়ে, ঠোঁট নেড়ে এমনভাবে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে, যাতে করে আপনি প্রলুব্ধ হয়ে তাদের প্রতি এক ধরনের নিষিদ্ধ আকর্ষণ অনুভব করবেন। আপনি ৬০ কিংবা ৭০ বছরের বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা হওয়ার পরও সঙ্গী বা সঙ্গিনী হিসেবে ১৩-১৪ বছরের কিশোর-কিশোরীর সঙ্গ পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবেন।
এখানেই শেষ নয়, ভ্রষ্টাচার এবং বিকৃত মানসিকতার উলঙ্গ দৃশ্যগুলো আপনি দেখতে পাবেন কোমলমতি শিশুদের ড্যান্স বা নৃত্য প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে। কতই বা ওদের বয়স হবেÑ বড়জোর ৮ বা ১০ বছর! এসব শিশু জোড়ায় জোড়ায় নৃত্য পরিবেশন করে। একটি ছেলে-মেয়ে একান্ত গোপনে যেসব যৌন সুড়সুড়িমূলক কর্মকাণ্ড করতে লজ্জা বোধ করবে, সেসব কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে করে দেখানো হয় এসব শিশুর মাধ্যমে। তাদের প্রতিটি নৃত্যের মূল মুদ্রা হলো কে কত জোরে তার মধ্যপ্রদেশ দোলাতে পারে এবং কে কত দক্ষতার সাথে নিজোট উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার দুই পা ফাঁক করে রাখতে পারে। তারপর তারা চোখে, মুখে, ঠোঁটে ও বুকে যৌনতার ঝড় তুলে বিভিন্ন ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে আপনাকে প্রলুব্ধ করবে তার বয়সী শিশুর দিকে অনৈতিকভাবে তাকানোর জন্য এবং আপনি যদি না-ও তাকান, তবে আপনার কিশোর-কিশোরী বা বালক-বালিকা পুত্র-কন্যা তো তাকাবেই। আর এক শ্রেণীর মানুষও তাকাবে আর এরা হলোÑ আপনার পিয়ন, ড্রাইভার, দারোয়ান এবং অশিক্ষিত শ্রমজীবী যুবক-যুবতী। ফলে কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে আপনার ঔরসজাত বালক বা বালিকাটি যদি কারো দ্বারা নিগ্রহের বা লালসার শিকার হয়েই বসে তবে আপনি কাকে দায়ী করবেন!
প্রিয় ইনু ভাই! এখনো সময় আছে কিছু একটা করুন। সুন্দর একটি সম্প্রচার নীতিমালা তৈরি করুন। ভারতীয় চ্যানেলগুলো বন্ধ করুন। ওদের সমাজ পচে গেছে। তাই ওদের কোনো কিছু আমাদের অনুসরণ করার দরকার নেই। চীন, জাপান বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখুন, ওসব দেশে এসব দেখানো হয় না। আপনি পারবেন। আপনি অবশ্যই পারবেন। আপনার অতীত যোগ্যতা এবং কর্মতৎপরতা অন্তত তাই প্রমাণ করে যে, আপনি চাইলে তথ্যমন্ত্রী হিসেবে এ জাতিকে এক মহাধ্বংসযজ্ঞ থেকে উদ্ধার করতে পারবেন।
ধন্যবাদান্তেÑ গোলাম মাওলা রনি
সংগৃহিত: নয়াদিগন্ত
Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

২৫শে মার্চ সেই কালরাত

এস কে দাস: ২৫ মার্চের মধ্যরাত। দিনের ক্লান্তি শেষে গভীর ঘুমে নিমগ্ন ঢাকার মানুষ। ঠিক সেই সময় সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে পড়ল ট্যাংক আর সাঁজোয়া যান। নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠল পাকিস্তানি বাহিনী। বাঙালির জীবনে নেমে এল চরম এক বিভীষিকা। একাত্তরের সে ঘটনা চিহ্নিত হয়ে আছে কালরাত হিসেবে। নির্মম সেই হত্যাযজ্ঞের আজ ৪৩তম বছর।

পরিকল্পিত এ হত্যাকা-ের পোশাকি নাম ‘অপারেশন সার্চলাইট’। পাকিস্তানি বাহিনী এ রাতে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আক্রমণ চালায়। নির্বিচারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে। এমনকি ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলও এ নির্মমতা থেকে রক্ষা পায়নি। কামান দেগে গোটা এলাকা মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার এক পাশবিক উন্মত্ততায় ফুটতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী।

বাঙালির প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারে গুঁড়িয়ে দিতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনও আক্রমণ করে তারা। অতর্কিত হামলায় হতবিহ্বল পুলিশ সদস্যরা পরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু এ আক্রমণ এমন আকস্মিক ও নির্মম ছিল যে, এক রাতেই ঘটে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু। পাকিস্তানি বাহিনীর এ বর্বর মৃত্যুময় বিভীষিকায় ভারী হয়ে ওঠে বাংলাদেশের বাতাস।

পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের গুঞ্জন কয়েক দিন ধরে বাতাসে ভাসতে থাকলেও ভয়াল সেই রাতের আকস্মিক আক্রমণে এ দেশের মানুষ যেন এক অন্ধকার গহ্বরে পতিত হয়। আবার একই সঙ্গে জ্বলে ওঠার প্রেরণাও পায়, শাণিত হয় প্রতিশোধস্পৃহা।

পশ্চিম পাকিস্তানের পরিকল্পিত এ হত্যাকা-ের মূল উদ্ধেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দমন করা। এ দমনের প্রথম পদক্ষেপ ২৫ মার্চের রাত। পরবর্তী নয় মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এ নির্মমতা চালিয়ে যায়। নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও ধ্বংসের তা-বলীলা চলতে থাকে। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় ফুঁসতে থাকা সাত কোটি বাঙালি।

২৫ মার্চ রাতের সেই গণহত্যার পর স্বাধীনতার ঘোষণা যে উজ্জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দেয়, পরবর্তী সময়ে তা প্রতিরোধের সাহসী উচ্চারণে রূপ নেয়। প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেয় কোটি বাঙালি। সঞ্চিত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুবাহিনীর ওপর। তারই ধারাবাহিকতায় ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালি পায় একটি স্বাধীন দেশ।

প্রতি বছরের মতো এবারো চরম ঘৃণা, বেদনাময় স্মৃতি আর গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বাঙালি জাতি স্মরণ করবে দিনটি। আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করা হবে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

আদর্শ ও নীতির রাজনীতি মুক্তি পাক

এস কে দাস: বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক নয়, তা আমরা জানি। বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও আমরা জানি সংকটের মূল উত্স রাজনীতি। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এ অচলাবস্থা ও সংকট সৃষ্টি হলেও আমরা জানি বিরোধের মূলে একটি আদর্শিক-নৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।
অনেক দিন ধরেই দেশের নাগরিকসমাজ দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক কাতারে রেখে দুটি ক্ষমতাপাগল দল হিসেবে চিহ্নিত করে যাচ্ছেন। বর্তমান সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর এই বক্তব্য ও সমালোচনা আরও ব্যাপকভাবে ও তীব্রতার সঙ্গেই হচ্ছে। কিন্তু কথাটা অনেকাংশে সত্য হলেও দেখা যাচ্ছে, দুই বড় দলের কেউই তাদের স্ব-স্ব নীতি-আদর্শের জায়গা থেকে সরতে রাজি নয়। বস্তুত বর্তমানে আদর্শিক-নৈতিক অবস্থানে তাদের অটলতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
আমরা জানি, দুই দলের মধ্যে আদর্শিক ঝোঁক কার কোন দিকে। আদর্শিক অবস্থানের দৃঢ়তা এক ধরনের নৈতিক ভূমিকা ও অবস্থান তৈরি করে। আমাদের সময় সঠিকভাবেই মনে করছে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দলকে সমর্থন দিয়ে আজ বিএনপি নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। একটা বিষয় বাংলাদেশের কোনও নাগরিক অস্বীকার করতে পারবে না— তা হল মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে, এটি হচ্ছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সর্বোপরি, বিষয়টিতে কোনও অতিরঞ্জন, বিকৃতি বা বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। নিশ্চিত করেই বলা যায়, তরুণ প্রজন্ম এ গৌরবের অংশীদার হতে চাইবে, চাইছে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধকে কোনওভাবেই ইসলাম ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে খাড়া করা যাবে না। এ নিয়ে সাময়িক বিভ্রান্তি হতে পারে কারও, কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সব ধর্ম-বর্ণ-জাতিকে গ্রহণ করার যে মানবিক ঔদার্যের প্রকাশ ঘটেছিল, তাকে ইসলামের বিপরীতে দাঁড় করাতে চাইতে পারে। কিন্তু তাতে ইসলামের মূল শিক্ষা ও মহানুভবতার ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করা হয়। যারা একাত্তরে ইসলাম ধর্মের নামে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তারা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ ভুলে গিয়ে জালেমের আদর্শ নিয়েছিল ও জালেমদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছিল।
আমরা বরং বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করব— যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানো গেল না, যখন বাংলাদেশ একেবারেই বাস্তবতা, আর আজ বিয়াল্লিশ বছর পরও সেই দেশ টিকে আছে ও সবাইকে বিস্মিত করে এগিয়ে চলেছে তখনও এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কি কোনও স্বাভাবিক, সত্ রাজনীতি হতে পারে; ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি হওয়া তো দূরের কথা?
জামায়াতে ইসলামী পুনরুজ্জীবিত হয়েছে আজ তিন যুগ হতে চলল। ভাবা যায়, এতদিন ধরে তারা একইভাবে একাত্তর-পূর্ববর্তী ধারার রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে! পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক দলকে যে তার কৌশল ও অবস্থান পরিবর্তন করতে হয় তা তাদের নেতৃত্ব কেন ভাবেনি, সেটা সত্যিই বিস্ময়কর ব্যাপার। তারা বরাবর ইসলামি বিপ্লবের কথা বলে এসেছে, অথচ ইসলামের ইতিহাসে আমাদের নবী এবং পরবর্তী সফল খলিফাদের জীবনেই আমরা পাই প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয়। ফলত কৌশল হিসেবে কখনও তারা ইহুদিদের সঙ্গে, কখনও খ্রিস্টানদের সঙ্গেও সখ্য করেছেন, তাদের সহায়তা নিয়েছেন, সহায়তা দিয়েছেন। কখন জেহাদি ভূমিকা নিতে হবে, কখন সমপ্রীতির পথে চলতে হবে, যে-নেতৃত্ব তা উপলব্ধি করতে পারে না, সে তো অন্ধ ও স্থবির। নতুন কৌশল হিসেবে জামায়াত জোর দিয়েছে দল ও দলীয় ব্যক্তিদের আর্থিক ভিত্তি দৃঢ় করার ওপর। দলটি ব্যাংক-বিমা-এনজিও ও অন্যান্য আর্থিক কর্মসূচির মাধ্যমে নির্ভরশীল সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি ও এর পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। যতদূর বোঝা যায়, বরাবর ‘ইসলাম বিপন্ন’ এই ধুয়া তুলে আর ধর্মীয় বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণ ও সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে জামায়াত। এ কাজে দলটি সব সময় আওয়ামী লীগ এবং দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। এভাবে একদেশদর্শী ভূমিকা নেওয়ায় ইসলামের সাম্য ও উদার মানবতার নীতি ও বাণী তাদের হাতে বারবার দলিত ও উপেক্ষিত হয়েছে।
ফলে বাস্তবতা হল এই— জামায়াত একদিকে জাতির গৌরবময় ইতিহাসের ও অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করতে চাইছে। বলা যায়, জাতির ইতিহাস ও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ আজ। তাতে বিপ্লবের নামে বাস্তবে তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে ধ্বংসাত্মক নাশকতামূলক কাজকর্মের ওপর। এভাবে কোনও রাজনীতিকেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
দেশে ও প্রতিবেশী দেশে এ রকম ভ্রান্ত বিপ্লবী রাজনীতির করুণ পরিণতি আমরা দেখেছি। স্বাধীনতার পরপর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করে জাসদ দেশের তরুণ মেধাবী এক প্রজন্মের বিশাল ক্ষতি করেছে, সত্তরের দশকের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনে একইভাবে মেধাবী তারুণ্যের বিপুল অপচয় ঘটেছে। জামায়াত-শিবির গত তিন দশকে অনেক মেধাবী তরুণকে একইভাবে ইসলামি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়ে ভ্রান্ত রাজনীতির কুহকে বিপ্লবের কানাগলিতে রুদ্ধ করে ফেলেছে।
জামায়াতকে আজ নিজেদের রাজনীতি নিয়ে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে আত্মসমালোচনার পথে যেতে হবে, অতীতের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রক্তরঞ্জিত হাত নিয়ে গণতন্ত্রের রাজনীতি চলতে পারে না, ইসলামি রাজনীতিও নয়! জামায়াত ভুল পথে চলছে, তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। বিএনপি? যত দোষই সুশীলসমাজ দিক না কেন, শেখ হাসিনার জেদ বলুন, গোঁয়ার্তুমি বলুন, তা কিন্তু তার দলকে নিছক ক্ষমতার বৃত্ত থেকে বর্তমানে এক আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দানে হাজির করে নিয়ে এসেছে। অল্প কয়েকটি সমমনা প্রগতিশীল দল ছাড়া অন্যরা তাকে একা ঠেলে দিয়েছে এই লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধুকন্যা তাতে দমেননি, ভয় পাননি, হয়তো মাঝে মাঝে দুঃখ-কষ্ট-রাগ সামলাতে পারেননি, এ কঠিন সময়ে তার পাশে যাদের থাকার কথা ছিল, তাদের বিরুদ্ধতায় ক্ষুব্ধ-বিষোদ্গার করেছেন বটে, কিন্তু লড়াইটা জারি রেখে তিনি আদর্শকে নৈতিক অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছেন। ফলে সম-আদর্শে বিশ্বাসী যারা এ লড়াইয়ে দূরে থাকছেন তারা কিন্তু ইতিহাসের কাছে নৈতিকভাবে দায়ী থাকবেন। এটাও মনে রাখতে হবে, লড়াইয়ের মূল রণক্ষেত্র অর্থাত্ যেখানে মূল প্রতিপক্ষ রয়েছে তা বাদ দিয়ে আলাদা ফ্রন্টে থাকা বা ভিন্ন তত্পরতা কখনও শৌখিনতার মাত্রা ছাপিয়ে যেতে পারবে না। আর যা-ই হোক আজকে বামপন্থার কিংবা বুদ্ধিজীবীদের শৌখিনতার পরিণতি দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না। মঙ্গল হবে না বিএনপিরও নৈতিক পরাজয়ের অবস্থানে একগুঁয়েমি করে থেকে যাওয়াটা। তাতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট শুধু বাড়বে। আমরা জানি মানুষের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার একটা মাত্রা থাকে। মাত্রা ছাড়া দুঃখ-কষ্ট জাতির ওপর চাপিয়ে দিতে পারলে অনেক সময় সমাজে যে প্রবল চাপ তৈরি হয় তাতে শুভশক্তিকেও পিছু হটতে হয়। কিন্তু সেটা কখনও জাতির জন্য কল্যাণকর হয় না। কারণ তাতে ইতিহাসের পশ্চাদযাত্রা প্রায় অবধারিত হয়ে পড়ে।
জামায়াতের মতোই বিএনপিকেও ভাবতে হবে, ভাবতে হবে তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের রাজনীতির থেকে স্বতন্ত্র, সম্ভব হলে আরও অগ্রসর, রাজনীতি দল দুটি দিতে পারে কিনা জাতিকে। কিন্তু একাত্তর-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা নিয়ে বেগম জিয়া দলকে জামায়াতের সহযোগীতেই পরিণত করছেন। নাশকতা ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ওপর নির্ভর করে বিএনপির কোনও তাত্ক্ষণিক লাভ যদি হয়ও, সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হবে অনেক বেশি। কারণ নৈতিক পরাজয়ের পর একটি দলের সত্ রাজনৈতিক কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা থাকে না। তখন তাদের ছাপিয়ে দলে ভাড়াটে মাস্তান ও কর্মীরা জায়গা দখল করে নেবে। সেটা আখেরে ক্ষতিকর হবে। দেশের সুশীলসমাজের কাছেও আবেদন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়ানোর প্রয়োজন নেই তাদের। কিন্তু টক শো-কলাম-মানববন্ধনে তারা যেন জাতির ভবিষ্যত্ মাথায় রেখে কথা বলেন, ইতিহাসের প্রেক্ষাপট মনে রেখে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নেন এবং বর্তমান সংকটের আদর্শিক ও নৈতিক দিকটি বুঝেই নিজেদের ভূমিকা নির্ধারণ করেন।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Responsive WordPress Theme Freetheme wordpress magazine responsive freetheme wordpress news responsive freeWORDPRESS PLUGIN PREMIUM FREEDownload theme free