বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা: বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার অবদান

সালমা আক্তার নিশু:

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস সুপ্রাচীন। প্রাচীকালে, মধ্যযুগে ও ব্রিটিশ আমলে প্রাথমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো তখন শিশুরা পাঠশালা, মক্তব অথবা গুরুগৃহে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করত। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অর্ন্তভুক্ত ছিল না। অত:পর ইংরেজ শাসন আমলে প্রাথমিক শিক্ষা ধারার কিছুটা পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন সরকারি দলিল ও মিশনারিদের তথ্য মতে বাংলা প্রদেশে ৮০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। তারপর অনেককাল পেরিয়ে আসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অর্ন্তÍভুক্ত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্য ২৯৬৩৩ নেমে আসে। যা ১৯৭০ এসে আরও কমে ২৯০২৯ টিতে নেমে আসে। পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে থাকলেও অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল বেসরকারি। শিক্ষকের বেতন অত্যন্ত কম ছিল। প্রাথমিক শিক্ষায় ছিল সরকারের অবহেলা।

অত:পর ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় ১৯৭৪ সালেড. কুদরাত-এ-খোদা শিক্ষা কমিশনে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮ বছর করার সুপারিশ করেন।

কিন্তু১৯৭৫-এ ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বঙ্গন্ধুকে সপরিবারে নৃসংসভাবে হত্যা করায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার সকল পদক্ষেপ মুখ থুবড়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষায় স্মৃবিরতা নেমে আসে। ড. কুদরাত-এ-খোদা শিক্ষা কমিশন আলোর মুখ দেখেনি। এরপর দীর্ঘ সময় প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন থেমে থাকে। অতঃপর ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেন। তিনি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে ‘ভিশন ২০২১’ শীর্ষক লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এই ‘ভিশন ২০২১’-এ দেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আর সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই, বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে আরও ২৬১৯৩ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও একটি মাইলফলক স্থাপন করেছেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করেন। ২০১৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের জীবনমান ও প্রশাসনিক উন্নয়নে প্রধান শিক্ষক পদটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদায় উন্নীত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগের চাহিদা মিটিয়েছেন। এ সবই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বংলা বির্নিমাণে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতাকরণে সহায়ক হবে। ইতোমধ্যে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীত হয়েছে। ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।

একীভূত শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০১১ সাল হতে প্রাথমিক স্তরের পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থীর হাতে চাররঙ, আকর্ষণীয়, সম্পূর্ণ নতুন পাঠ্য পুস্তক বিনামূল্যে শিক্ষা বছরের প্রথম দিনেই ‘বই উৎসব’ এর মাধ্যমে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কার, নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, স্যানিটেশন ও ওয়াশব্লক স্থাপনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে।

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এক লাখের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ৩৪তম বিসিএস উত্তীর্নদের মধ্য হতে ৮৯৮ জনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আইসিটি বেইজড প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে ল্যাপটপ প্রদান, ইন্টারনেট সংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া চালু করে আইসিটি বেইজড শ্রেণিকক্ষ চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষকেরা নিজেরাই ডিজিটাল কন্টেন্ট, তৈরি করে শ্রেণি পাঠদান করতে পারছেন। সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় দেড় বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক কর্মকর্তাদের প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তাদের কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও মূল্যায়নের জন্য দেশব্যাপী ২০০৯ সাল হতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের সাথে সাথে তার শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে ও নেতৃত্ব বিকাশে শেখ হাসিনা সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, মিড ড মিল চালুকণ, স্টুডেন্ট কাউন্সিল গঠন, কাব-স্কাউট দল গঠন, ক্ষুদে ডাক্তার দল গঠন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী অ্যালামনাই এসোসিয়েশন গঠন, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ড কাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট উল্লেখযোগ্য।

২০১৪ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা সংক্রান্ত অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন- ‘মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক’ এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে বলেছেন- ‘অস্ত্র নয়, শিক্ষায় বিনিয়োগ করুন।’ জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে সরকারের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে তা আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষকদের মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়ের ভর্তির আনুপাতিক হারের ক্ষেত্রে মেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৫০ ভাগ উন্নীত হওয়ায় জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা বৃদ্ধির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো পুরস্কার ‘শান্তি বৃক্ষ’ লাভ করেছেন, যা জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জনে বাংলাদেশ বদ্ধ পরিকর। এর অন্যতম লক্ষ্য শিক্ষায় ন্যায্যতা ও একীভূততা অর্জনের পাশাপাশি জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক। সে লক্ষ্যে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। নিরক্ষরতা দূরীকরনে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। দেশের প্রতিটি নাগরিককে সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, এসএমসি, পিটিএ, জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসীসহ সমাজের প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। শীঘ্রই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নত টেকসই রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। আজকের শিশুরা তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেমের অনির্বান শিখা প্রজ্জলিত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করবে।

 

সালমা আক্তার নিশু
প্রধান শিক্ষক
করিমখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
মোবাইল: ০১৮৪৮৩৮৯৪০৫

 

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার সঙ্গে প্রতারণা জাল-জালিয়াতি

বিশেষ প্রতিবেদক:

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা নিয়ে ব্যাপকহারে জাল-জালিয়াতি, দুর্নীতি হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তাও মানা হয়নি। ২৬ হাজার ১শ’ ৯৩টি স্কুল জাতীয়করণের জন্য প্রধানমন্ত্রী যে তালিকা অনুমোদন করেছেন সেটি চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তালিকার বাইরের অনেক স্কুল জাতীয়করণ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে তালিকার মধ্যের অনেক স্কুলকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার সঙ্গে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এসব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্কুল জাতীয়করণকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যাপকহারে ঘুষ লেনদেন হয়েছে। স্কুল জাতীয়করণ বাণিজ্যের সুবাদে একটি মহল হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। ঘুষের মাত্রা অনুযায়ী প্রজ্ঞাপনের তালিকায় স্কুলের নাম ঢুকেছে অথবা বাদ পড়েছে। যেসব স্কুলের তদবিরকারকরা টাকা দিতে পেরেছেন তাদের স্কুলকে তালিকায় ঢোকানো হয়েছে। অন্যদিকে যারা টাকা দেননি বা কম টাকা দিয়েছেন তাদের স্কুলকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর দালালের মাধ্যমে এসব ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এ বাণিজ্যের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ পর্যন্ত কতটি স্কুল জাতীয়করণ হয়েছে প্রজ্ঞাপনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট হিসাব মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। তবে মন্ত্রণালয়ের মৌখিক হিসাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত ২৬ হাজার ১শ’ ৯৩টি স্কুলের কোটা পূরণ হতে আর মাত্র ৩৪টি স্কুল বাকি আছে। অর্থাৎ (২৬,১৯৩-৩৪)=২৬,১৫৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতিমধ্যে জাতীয়করণ করা হয়েছে। কিন্তু, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর তালিকার ৭৩টি স্কুল আছে যেগুলো এখন পর্যন্ত জাতীয়করণ করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর তালিকার (৭৩-৩৪)= ৩৯টি স্কুল কীভাবে বাদ পড়ছে? এসব স্কুলের স্থলে নিশ্চয়ই অন্য নতুন স্কুল ঢুকে পড়েছে?

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব প্রশ্নের কোন জবাব দিতে পারছেন না। মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের সঙ্গে এ নিয়ে সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বরাবরই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। একাধিকবার সময় দিয়েও তিনি তা রক্ষা করেননি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি রাজধানীর প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত শিক্ষক মহাসমাবেশে ২৬ হাজার ১শ’ ৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রস্তুতি হিসেবে সারাদেশ থেকে তথ্য নিয়ে আগেই এই ২৬ হাজার ১শ’ ৯৩ স্কুলের তালিকা তৈরি করা হয়েছিলো। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুশাসনও নেয়া হয়েছিলো।

জানা গেছে, স্কুলের ক্যাটাগরি অনুযায়ী শুরুতে সবগুলো স্কুলকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেকটি ধাপের সব স্কুল এক প্রজ্ঞাপনে জাতীয়করণ করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে তৃতীয় ধাপের স্কুল জাতীয়করণ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো প্রজ্ঞাপনে। দেখা যাচ্ছে, কখনো কখনো অল্প বা গুটিকয়েক স্কুলকে জাতীয়করণের জন্যও আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। কিন্তু কেন এভাবে দফায় দফায় আলাদা প্রজ্ঞাপন করা হলো, এর কোনো জবাব নেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত ২৬ হাজার ১শ’ ৯৩ স্কুলের তালিকা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোথাও প্রমাণসাপেক্ষভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। আর তাই সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষেরও চ্যালেঞ্জ করার কোন সুযোগ ছিলো না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মর্জির উপর নির্ভর করতে হয়েছে মানুষকে। কর্মকর্তারা যখন যা বলেছেন সেটিই মানুষকে মেনে নিতে হয়েছে। কর্মকর্তারা কখনো বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় ‘ওমুক স্কুল’ আছে। আবার কখনো বলেছেন, ‘নেই’।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর তালিকার কথা বলে শুধুই সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হয়েছে। আদতে অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর তালিকা অনুসরণই করা হয়নি। কর্মকর্তারা এ মুহূর্তে অফিসিয়ালি স্বীকার করছেন, প্রধানমন্ত্রীর তালিকার ৩৯টি স্কুল জাতীয়করণের বাইরে অতিরিক্ত রয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এগুলোর স্থলে অন্য স্কুল জাতীয়করণ হয়ে গেছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বাস্তবে শুধু ৩৯টিই নয়, প্রধানমন্ত্রীর তালিকার এরকমের শত শত স্কুল রয়ে গেছে যেগুলো জাতীয়করণ করা হয়নি। এসব স্কুলের পরিবর্তে কারসাজির মাধ্যমে অন্য স্কুল ঢোকানো জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপনে। এসব স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্য অথবা শিক্ষকরা ঢাকায় এসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দফায় দফায় ধর্ণা দিচ্ছেন। তাদেরকে আগে এক সময় বলা হয়েছে তালিকায় নাম আছে। এখন বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় নাম নেই। কিন্তু তাদের কাছে এমন কোন প্রমাণও নেই যে তারা চ্যালেঞ্জ করবেন- তালিকায় নাম আছে কি নেই। শুধুই আফসোস করছেন, তখন চাহিদামতো টাকা দিলে স্কুল জাতীয়করণ হয়ে যেতো। এ সংকটে আর পড়তে হতো না।

স্কুল জাতীয়করণের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত সার-সংক্ষেপ এবং প্রজ্ঞাপনের কপি নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় নিরাপদ স্থানে সংরক্ষিত থাকার কথা। অথচ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল জাতীয়করণের এই প্রজ্ঞাপনগুলো দেখাতে পারছে না। প্রজ্ঞাপন বিষয়ে এক ধরনের লুকোচুরি চলছে বলা যায়। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ রায়ের মাধ্যমে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই প্রজ্ঞাপনগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছিল শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে। গত ৭ মে রবীন্দ্রনাথ রায় এ তথ্যগুলো সরবরাহের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন। কিন্তু, ১৬ মে পর্যন্ত তিনি এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। ১৬ মে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের সঙ্গে তার দফতরে সাক্ষাত করে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী শুরুতে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেদিন তিনি ব্যস্ত আছেন এবং পরদিন সকাল ১১ টায় এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান। শীর্ষকাগজের এ প্রতিবেদক পরদিন সকাল ১১টায় তার দফতরে গিয়ে জানতে পারেন, মন্ত্রী অফিসে আসেননি এবং এদিন আর আসবেনই না। এরপর ২৮ মে মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে কথা বলতে চাইলে সেদিনও তিনি এড়িয়ে যান। ৩০ মে কথা বলবেন বলে আবারো সময় দেন। কিন্তু, ৩০মে তিনি অফিসেই আসেননি।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা : করণীয়

সালমা আক্তার নিশু,১৭ জুন : শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা মজবুত না হলে মাধ্যমিক, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা সফল হবে না। তাই শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষাকে মজবুত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ শিক্ষক। শিক্ষকদের যথাযথ বেতন ও মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল এসব মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করা সম্ভব। তা হলেই সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে।

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণেও সাংবিধানিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বাধ্যবাধকতা মানতেও প্রাথমিক শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। বলা হয়ে থাকে — যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বেশি সে দেশ তত উন্নত। প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিশুই দেশের সম্পদ। এ সকল শিশুকে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প নেই। তা ছাড়া বিদ্যালয় ক্যাচমেন্ট এলাকার বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শতভাগ শিশুকে ভর্তির আওতায় আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই সঠিক শিশু জরিপ করা। বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় ও উন্নত হিসেবে গড়ে তোলা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানকে আধুনিক পদ্ধতি, কৌশল ও আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে আরও কার্যকর করা। প্রতিটি শিশুকে দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় ইতিহাস জানানো প্রয়োজন। ধর্মীয়, নৈতিক ও উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী অর্জনে সহায়তা করা। এক্ষেত্রে শিক্ষক, বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধিগণ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারে।

অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, ভিশন ২০২১, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও আমরা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বর্তমানে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপবৃত্তি, মিড-ডে মিল চালু করার মাধ্যমে শিশুদেরকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে ও শিশুদের অপুষ্টি দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও কার্যকর উদ্যোগ। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। জরুরি ভিত্তিতে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। আধুনিক ও উন্নত ফিটিংস দ্বারা বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় ও স্বাস্থ্যসম্মত করতে হবে। সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাক্রমকে পরিমার্জন করা হয়েছে। এই শিক্ষাক্রমকে সর্বস্তরে যথাযথভাবে বিস্তরণ ঘটাতে হবে। যোগ্যতাভিত্তিক সুঅভীক্ষা প্রণয়ন ও মুল্যায়ন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। তবেই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সুফল আসবে।

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে উপসংহারে আমরা বলতে পারি যে, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যাপ্ত মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, আরও বেশি বেশি সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা সবার জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রাথমিক শিক্ষা আশাকরি।

আমরা স্বপ্ন দেখি অচিরেই বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এজন্য সকলকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। জয় হোক প্রাথমিক শিক্ষার। জয় হোক শিক্ষার।

সালমা আক্তার নিশু

প্রধান শিক্ষক করিমখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

কালবৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্ত স্কুল খোলা আকাশের নিচে চলছে পাঠদান

বগুড়া প্রতিনিধি : ৯ মে : কালবৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার লুস্কুর আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে বসেই চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ক্লাস করতে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, আকাশে মেঘ দেখলেই দেয়া হয় ছুটি।

২০০০ সালে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের উদ্যোগে লুস্কুর আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৫ সালে বিদ্যালয়টি (তৃতীয় ধাপে) জাতীয়করণ হয়। মাটির ঘরেই চলে আসছিল বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম।

গত ৩০ এপ্রিল রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যালয়টির মাঠির ঘরের ছাউনি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এতে বিদ্যালয়টিতে পাঠদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ না করে খোলা আকাশের নিচে চলছে পাঠদান। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজেই পাঠ গ্রহণ করছে।

লুস্কুর আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যালয়ের দুটি ঘর ভেঙে পড়েছে এবং ছাউনি বিধস্ত হয়ে গেছে। তাই কয়েক দিন ধরে বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচেই ক্লাস নেয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ে একশজন শিক্ষার্থী থাকলেও খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নেয়ার কারণে অনেকে শিক্ষার্থীই স্কুলে আসছে না। আবার যারা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে আসছে তাদেরও ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো অর্থ না থাকায় কবে নাগাদ বিদ্যালয়টির মেরামত করা সম্ভব হবে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় প্রধান শিক্ষক।

প্রধান শিক্ষক আরও জানান, বিদ্যালয়টি মেরামতের সহযোগিতা চেয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বরাবরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

সরেজমিনে সোমবার সকালে লুস্কুর আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গিয়ে কথা হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বাঁধন চন্দ্র, মনিকা ও মাহামুদার সাথে। তারা জানায়, গত কয়েকদিন ধরেই খোলা আকাশের নিচে মাঠে বসে লেখাপড়া করছি। রোদ গরমে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। সরকারের কাছে আবেদন অতি দ্রুত আমাদের বিদ্যালয়ের ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘড়গুলো মেরামত করে দিন।

নন্দীগ্রাম উপজেলা শিক্ষা অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি মেরামতের জন্য প্রধান শিক্ষকের আবেদন পাওয়া গেছে। তার আবেদন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা উন্নয়ন শাখায় পাঠানো হয়েছে। আশা করি শিগগির স্কুলটি মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মাগুরায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলছে ১৭০ শিশুর পাঠদান।

মাগুরা প্রতিনিধি ৬ মে : মাগুরা শহরের ভায়নার মোড়ে আছিয়া খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলছে ১৭০ শিশুর পাঠদান। যেকোনও সময় ভবনটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই শিশুদের পাঠদান চলছে বলে জানান স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-যশোর মহাসড়কের পাশের স্কুল ভবনটিতে ১৭০ ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করে। ১৯৯৪ সালে ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টের আওতায় এই বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি তৈরি হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়তে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে ভবনটির। কয়েক বছর আগে ছাদের আরসিসি পিলারের ক্ষয়ে যাওয়া জায়গাগুলো সামান্য প্লাস্টারের মাধ্যমে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তাতেও কোনও লাভ হয়নি।

দুর্বল অবকাঠামোর কারণে সব শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে রড বের হয়ে গেছে। ফাটলও দেখা দিয়েছে ছাদে। বৈদ্যুতিক ফ্যানের ভেতরে পানি ঢুকে আটটি ফ্যানই পুড়ে গেছে। এ কারণে ফ্যান ছাড়াই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এদিকে পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার শুরু থেকেই স্কুল মাঠটি পানি ও কাদায় ডুবে আছে। বেশি বৃষ্টি হলে মাঠ উপচে ক্লাসরুমে ও লাইব্রেরি রুমে পানি ঢুকে পড়ে।

বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া, মুন্নি খাতুন ও মায়া খাতুন, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র হৃদয় হোসেন জানায়, যেকোনও সময় ছাদ থেকে পলেস্তরা খসে আহত হওয়ার ভয়েই ক্লাস করতে হচ্ছে। ফ্যান না চলায় গরমে সবার কষ্ট হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ক্লাসরুমে জমে যায়।

ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, পুরো বর্ষাকাল জুড়ে স্কুলমাঠ পানি ও কাদায় ভরে থাকে। তাই ক্লাস না থাকলেও ক্লাসরুমেই বসে কাটাতে হয়। এজন্য অনেকেই স্কুলে ঠিকমত আসে না।

অভিভাবক রিপন হোসেন, নান্নু মিয়া, নিজাম মিয়া, আশরাফুল ইসলাম, আঙ্গুর বেগম, হালিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘স্কুল ভবনটির জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকি। ভবনটি যে শিক্ষার্থীদের মাথার ওপর ভেঙে পড়তে পারে তা দেখার কেউ নেই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালী রানী বিশ্বাস বলেন, ‘ভবনের চারটি রুমের সব ক’টিতেই ছাদের পলেস্তরা ও ইটের খোয়া খসে পড়েছে। যেকোনও সময় পুরো ভবনটি ধসে পড়তে পারে।  ১৭০ জন ছাত্রছাত্রী ও ছয় শিক্ষকের প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে এ সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনও লাভ হয়নি। স্কুল ভবনের যে অবস্থা, তাতে যেকোনও সময় আমরা রানাপ্লাজার মতো ভায়বহ আরেকটি দুর্ঘটনার শিকার হতে পারি।’

প্রধান শিক্ষক জানান, স্কুলের মাঠের পানি বের করে দেওয়ার জন্য পৌরসভার মেয়রকে জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খেলাধুলাও করতে পারছে না ছাত্রছাত্রীরা।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিদ্যালয়টি ভবনটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা ঝুঁকি নিয়েই এখানে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই স্কুলসহ জরুরি ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের জন্য ১০টি স্কুলের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

এ ব্যাপারে এলজিইডির মাগুরা সদর উপজেলা প্রকৌশলী আনন্দ কুমার ঘোষ বলেন, ‘ভবনকে ঝুঁকিমুক্ত না করে ক্লাসে ছাত্রদের লেখাপড়া করানো মোটেই ঠিক হচ্ছে না। আমরা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পাঠদান ব্যাহত চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : ২৭ এপ্রিল : চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি জেলার ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত বালক-বালিকা থাকলেও পরবর্তীতে তৃতীয় শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত শুধুমাত্র বালিকাদেরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপদান করা হয়। নারী শিক্ষা সম্প্রসারণেই শুধু নয়, মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অতীত উজ্জ্বল গৌরব রয়েছে। সেই গৌরব শুধু ধুলণ্ঠিতই নয়, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পাঠদান মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে ও তাদের শাসনে কিছু শিক্ষকের অনিহাও পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ।

চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি দু শিফটে চলে। প্রভাব ও দিবা শাখায় মোট ছাত্রীর সংখ্যা দু হাজার ২১৫ জন। সহকারী শিক্ষক পদ ৫০টি হলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ২৩ জন। অর্ধেকেরও কম। প্রধান শিক্ষক পদটিও শূন্য। সহকারী প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পালন করলেও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে তিনি পাঠদানই শুধু নয়, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাও ধরে রাখতে পারছে না। প্রতি শিফটের দুটি করে শাখা একীভূত করেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। সেটা সম্ভবও নয়। শিক্ষক সঙ্কট অবশ্য একদিনে তীব্র হয়নি। কারণে অকারণে বা বিশেষ তদবিরে শিক্ষক বদলি করলেও তার বিপরীতে শিক্ষক না দেয়ায় একের পর এক পদশূন্য হয়েছে। শূন্যতা বেড়ে বর্তমানে তাথৈ অবস্থা। তাছাড়া বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ২০১৬ সালের ৩ ডিসেম্বর পরীক্ষা দেয়ার সময়ে কয়েক শিক্ষকের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের কারণে আত্মঘাতী হয়। তার প্রতিবাদ জানাতে সহপাঠীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হলে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। তদন্তে অভিযুক্ত ৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের বিষয় উঠে আসে। প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করার জন্য নানা কৌশলসহ শিক্ষার্থীদের সাথে বৈরী আচরণের কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ওদের বদলি করা হয়েছে মেহেরপুরে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশের প্রেক্ষিতে বদলি হওয়া শিক্ষকেরা যদি চুয়াডাঙ্গা ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন তাহলে সেই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এরকম আশঙ্কা যেমন বিরাজ করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে, তেমনই সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শাসনে রাখার আগ্রহও হারিয়েছেন কর্তব্যরত শিক্ষকদের অনেকে। একদিকে শিক্ষক স্বল্পতা, অপরদিকে শাসনে অনিহা বা ভীতি বিদ্যালয়টির পাঠন-পঠনের পরিবেশ কেড়ে নিয়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে বিদ্যালয়টির ব্যবস্থাপনা কমিটির তরফে তেমন উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টিও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতেই শুধু নয়, শিক্ষার মান সময়োপযুগি করতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিযুক্ত করা খুবই জরুরী। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা প্রয়োজন। একজনকে বদলি করার আগে তার বিপরীতে পদায়নের প্রয়োজনীয়তা আদেশদাতা কর্তার নিশ্চয় অজানা নয়। তাছাড়া শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর নীতিমালা বা জাকিরকৃত প্রজ্ঞাপন মেনে চলা হচ্ছে কি-না তা দেখা প্রশাসনেরই দায়িত্ব। অবশ্য সব কিছুর আগে দরকার বিদ্যালয়ের শিক্ষককে শিক্ষকতা করার মতো মানসিকতাসহ শিক্ষাদানের ও শিক্ষাগ্রহণের পরিবেশ।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

দীর্ঘ ২২ বছর বেতন-ভাতা পান না শিক্ষক-কর্মচারীরা

গাজীপুর প্রতিনিধি : ২৬ এপ্রিল : জেলার শ্রীপুর উপজেলার চিনাশুখানিয়া গ্রামের দিঘির চালা উচ্চ বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ২২ বছরেও এমপিওভুক্ত হয়নি। দীর্ঘ সময়ে স্কুলটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা।

অপরদিকে অবহেলিত রয়েছে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা থেকে। সেই সঙ্গে এলাকাবাসীর অনুদানের ওপর ভর করে কোনো রকম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে অজো পাড়াগাঁয়ের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।

এলাকার জনহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় ১৯৯৫ সালে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের চিনাশুখানিয়া এলাকায় গ্রামবাসীর প্রচেষ্টায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টি ১৯৯৯ সালের পহেলা জানুয়ারি শিক্ষাবোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমতি এবং ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি মাধ্যমিক পর্যায়ে একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়ে প্রতিবারই পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের অবদান রাখছে।

অবহেলিত গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষে এক একর সাড়ে ৬৩ শতাংশ জমির উপর জামাল উদ্দিন মাঝি ও আব্দুর রশিদ বেপারি জমি দিয়ে ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০০০ সালের ২ জুন গাজীপুর-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ ও তৎকালীন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. রহমত আলী এমপি নতুন ভবন নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে এলাকাবাসী ও শিক্ষকমণ্ডলীর নিজস্ব অর্থায়নে আঁধাপাকা ইটের তৈরি তিনরুমের একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। যা আজও বিদ্যমান রয়েছে। পরবর্তীতে চারপাশে টিনের ছাউনি দিয়ে তিনটি শ্রেণিকক্ষ তৈরি করে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়।

বর্তমানে টিনশেড শ্রেণিকক্ষের টিন ছিড়ে পেছন দিক থেকে ফাঁকা হয়ে গেছে। একটি শ্রেণিকক্ষও পাঠদান উপযোগী নয়, একটি মাত্র অফিস কক্ষ, শিক্ষার্থীদের বসার জন্য নেই পর্যাপ্ত বেঞ্চ, যা আছে তাও ভাঙা। এছাড়া টয়লেটের পরিবেশও নোংরা। এই টয়লেট ব্যবহারের ফলে দুগন্ধে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলা সদর হতে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটিতে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত নেই নিজস্ব খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, মেয়েদের জন্য কমন রুম, পানির ট্যাঙ্কি, বিজ্ঞানাগার, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির গ্যালারি ও শহীদ স্মৃতিফলকসহ অনেক কিছুই।

সরকার শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের আলোকে ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার স্তর পর্যন্ত আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করলেও প্রতিষ্ঠানে ‘আইসিটি’ বিষয়ের শিক্ষক তো দূরের কথা একটি কম্পিউটার ল্যাব পর্যন্ত নেই। একারণে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বা আইসিটি ও কম্পিউটার শিক্ষার ছোয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

এ বিদ্যালয়টিতে প্রতিষ্ঠালগ্নের কিছু সময় পর থেকে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন কাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া, সহকারী শিক্ষক হিসেবে জালাল উদ্দিন (গণিত), পাপিয়া ইয়াসমিন (বাংলা), আমজাদ হোসেন (ধর্ম), প্রদীপ চন্দ্র সরকার (বিজ্ঞান), আকবর হোসেন (ব্যবসায় শিক্ষা) ও আনোয়ার হোসেন (ইংরেজী) দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এদের মধ্যে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ প্রধান শিক্ষক ব্যতিত কারোর নেই। এছাড়া প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে একমাত্র অফিস সহকারী হিসেবে রীনা বেগম স্কুলটিতে কাজ করে যাচ্ছেন।

বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ২০ জন ছাত্র ও ২০ ছাত্রী, ৭ম শ্রেণিতে ২০ জন ছাত্র ও ২৫ ছাত্রী, ৮ম শ্রেণিতে ১৭ জন ছাত্র ও ১৩ ছাত্রী, ৯ম শ্রেণিতে ১৫ জন ছাত্র ও ২০ ছাত্রী এবং ১০ম শ্রেণিতে ১৭ জন ছাত্র ও ২৩ ছাত্রীসহ সকল শ্রেণিতে মোট ১৯০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ঠ শ্রেণির জন্য ৮০টাকা, ৭ম ও ৮ম শ্রেণির ১০০, ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ১২০ টাকা করে বেতন নির্ধারিত। সেই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোচিং ফিসহ ফরম পূরণের জন্য নেয়া হয় ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। এদের থেকে আদায়কৃত অর্থ দিয়ে দু’তিন মাস পরপর শিক্ষকরা মাত্র দুই হাজার টাকা করে বেতন পান। যা খুবই সামান্য।

একারণে প্রতিষ্ঠার ২২ বছরেও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ার ফলে সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে গত ২২ বছর বিনা বেতনে কাজ করছেন শিক্ষক-কর্মচারী। বর্তমানে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবতের জীবন যাপন করছেন।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রতি বছর জেএসসি এবং এসএসসিতে একাধিক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ লাভ করলেও অবকাঠামোগত দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটির কোনো উন্নয়ন হয়নি। ২০১৬ সালের জেএসসি পরীক্ষায় ৩৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন এ প্লাসসহ বাকি সবাই এ গ্রেড পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে গেল বছরের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল মাত্র ৫২%। ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮জন পাস করেছিল।

এলাকার ৪ কিলোমিটারের মধ্যে একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থাকলেও আর কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় নানা সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি অবহেলিত এলাকার ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। অনুরূপভাবে কর্মরত রয়েছে ৭ জন শিক্ষক ও ১ জন কর্মচারী। যদিও প্রয়োজন ১১ জন শিক্ষকের। বিদ্যালয়ে তিনটি বিভাগ খোলা থাকলেও বিজ্ঞান বিভাগে একজন শিক্ষকও নেই।

প্রতিষ্ঠানটি এতো সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও খুবই দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে পরিচালনা পরিষদে সভাপতি হিসেবে শ্রীপুর থানা যুবলীগের সভাপতি কমর উদ্দিন দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সংরক্ষিত ১ জন, শিক্ষক প্রতিনিধি ৩ জন, অভিভাবক প্রতিনিধি ৪ জন ও একজন দাতা সদস্যসহ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ১২ জন সদস্য রয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পুস্তক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেও আজও এমপিওভুক্ত করা হয়নি। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার লক্ষে আমাদের এমপি মহোদয় এ বিষয়টি একাধিকবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন।

তিনি জানান, সরকার বিদ্যালয়টি স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আমরা শিক্ষক-কর্মচারীরা কেউ বেতন ভাতা পাই না। গত ২২ বছর এভাবেই বিনা বেতনে কাজ করতে গিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী সবাই হাঁপিয়ে উঠেছি। বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে সকলের পরিবার মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কমর উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ ২২ বছর শিক্ষকেরা বিনা বেতনে পাঠদান করতে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্ত না হওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। শিক্ষক-কর্মচারী পরিবারের মানবিক দিক বিবেচনা ও অবহেলিত এলাকার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার কথা বিবেচনা করে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান তিনি। সেই সঙ্গে আগামী এক বছরের মধ্যে বিদ্যালয়টি এমপিও হবে বলেও তিনি আশাবাদী।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা আ: রশিদ বলেন, স্কুলটি এমপিওভূক্তি করার ব্যাপারে বহু চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। শিক্ষকদের মানবেতর দিন বিবেচনা করে ব্যক্তিগতভাবে কিছু টাকা দিয়ে তাদেরকে চালিয়ে রাখছি।

এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা পান না, এটা খুবই কষ্টের ব্যাপার। তবে বিদ্যালয় এমপিও হওয়ার বিষয়টি মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্যের দায়িত্ব। এছাড়া কোনো বিদ্যালয়ের যদি বয়স অনেক দিন হয় ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি থাকে এবং ফলাফল যদি ভালো হয় তাহলে এমপিও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

অতিদ্রুত এমন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এমপিওকরণের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শ্রীপুর উপজেলায় মোট ১৭টি বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত ছাড়াও চলছে। তাই শিক্ষকদের মানবেতর দিন বিবেচনা করে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়ানোর আহ্বান

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। সোমবার ইউজিসির অডিটোরিয়ামে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি সংক্রান্ত এক কর্মশালায় তিনি এ আহ্বান জানান।

এছাড়া কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সকলকে সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং সর্বোত্তম আচরণের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় উৎকর্ষতা সাধন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

কর্মশালায় অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করণের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

সভাপতির ভাষণে প্রফেসর শাহ্ নওয়াজ আলি দুর্নীতি রোধে দায়িত্বপালনকালে সকলকে সরকারি বিধি বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য আহ্বান জানান।

কর্মশালার ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলির সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন। এছাড়া দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিবৃন্দ এতে অংশগ্রহণ করেন।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

খেলার মাঠ রক্ষায় পুকুরপাড়ে শিশু শিক্ষার্থীদের অবস্থান, চুয়াডাঙ্গার নূরনগর-জাফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে পদস্থ কর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গার নূরনগর-জাফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠটি গ্রাস করছে পাশের পুকুর। গতকাল রোববার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বাড়ি ফেরার আগে মাঠগ্রাসী পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ভাঙন রোধে দায়িত্বশীলদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কোমলমতি শিক্ষাথীরা। পুকুরের ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠটি কিছুদিন পর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের অদূরেই নূরনগর-জাফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তিন একজর জমির ওপর ১৯৩৩ সালে স্থাপিত বিদ্যালয়টির অবকাঠামো। উন্নয়নের ছোঁয়ালাগে মূলত ১৯৮৫ সালে। সম্প্রতি নতুন একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২৫২। তিনটি গ্রামের শিশু-কিশোরদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছর ধরে সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করে চলেছে। এ বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি সংস্কারের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও সেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে কাজে লাগাতে হচ্ছে। বিদ্যালয় সংলগ্ন জাফরপুর-বেলগাছি সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করার কারণে ভেঙে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ সড়কটি সংস্কার করা যেমন দরকার, তেমনই দরকার বিদ্যালয়ের সীমানা পাঁচিল। পাঁচিল দেয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পূর্বপ্রান্তের বিশাল পুকুরের পাড় বাধা জরুরি হয়ে পড়েছে। পুকুরের ভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি বিলিন হতে বসেছে। তাছাড়া ওই ঝুঁকিপূর্ণ পাড় মাড়িয়েই শিশু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। অভিভাবকদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে পুকুরপাড় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকলেও তেমন কেউই এদিকে নজর দেননি। গতকাল রোববার দুপুরে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ভাঙন রোধের দাবি জানিয়ে বলেছে, ভাঙনের স্থানে মৃত্যুফাঁদ হয়ে রয়েছে। কবে যে কার ওতে পড়ে মরতে হবে কে জানে!
বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির নতুন সভাপতি মহাবুল হোসেন বলেছেন, বিদ্যালয়টির সীমানা পাঁচিল না থাকার কারণে শিক্ষার পরিবেশ যেমন ব্যাহত হয়, তেমনই পুকুরের ভাঙনের কারণে স্কুলের জমি হারিয়ে যাচ্ছে। পুকুর মলিকদের এদিকে তেমন নজর নেই। ফলে শিক্ষা বিভাগের এদিকে বিশেষ নজর দেয়া দরকার। অপরদিকে বিদ্যায়ের প্রধান শিক্ষক ফারজানা নাসিম বলেছেন, বিষয়টি ঊর্ধŸতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দৈন্যদশা

ডেস্ক: প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পরও কোনো কোনো বিদ্যালয়ের নেই নিজস্ব জমি ও স্থায়ী ভবন। খেলার মাঠ নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। কোথাও কোথাও পরিত্যক্ত শ্রেণিকক্ষে চলছে পাঠদান। বৃষ্টি হলে ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় মেঝে। কোনো কোনোটি ঝুঁকিপূর্ণ, ধসে পড়তে পারে যেকোনো সময়। কয়েকটি বিদ্যালয়ে নেই বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। সাইনবোর্ড থাকলেও নেই বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব। শিক্ষার মান নি¤œমুখী বলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। স্বল্প আয়ের দিনমজুর শ্রেণির পরিবারের শিশুরাই প্রধানত শিক্ষার্থী। সরেজমিনে ঘুরে ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এমন বেহাল দশা দেখা যায়।

অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে আছে শিক্ষক সংকট। পাঠদানে শিক্ষকদের উদাসীনতা দেখার কেউ নেই। বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে ত্রিশটি বিদ্যালয়ের সামনে রয়েছে ময়লার ভাগাড়, কিংবা প্রধান ফটকের সামনে বসছে হাটবাজার। দখল হয়ে আছে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার একমাত্র পথটি। সরকারি জমি দখল করে পশু বিক্রির স্থায়ী হাট বসানোয় কাপ্তানবাজার এলাকার খোদাবক্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি এখন তালাবদ্ধ।

তথ্যমতে, রাজধানীতে আছে ২৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত লাখের কাছাকাছি। বস্তির বাসিন্দা, রিকশাওয়ালা, ঠেলাগাড়িওয়ালা, পোশাককর্মীর মতো নিতান্তই স্বল্প আয়ের মানুষের সন্তানদের শিক্ষাদানের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে বিদ্যালয়গুলো। তাই ‘গরিবের পাঠশালা’ নামে পরিচিত এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকারের অনেক প্রতিশ্রুতিরই বাস্তবায়ন নেই। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের দাবি, ‘সমস্যা চিহ্নিত করে কোন বিদ্যালয়ে কী করতে হবে, এ অনুযায়ী, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

রাজধানীর নাজিরা বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বিদ্যালয়ের সামনের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা। বিদ্যালয়ের নেই নিজস্ব ভবন ও জমি। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা জাহান আরা জানান, বিদ্যালয়টিতে ৩৩৬ জন শিক্ষার্থী আছে। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহাগী মনি বলে, ‘ওর বাবা রিকশাচালক। নিয়মিত পাঠদান হয় না বলে বিদ্যালয়ে এসে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলে।’ মাঠ থাকলে খেলতে বেশি ভালো লাগত বলে জানায় সে।

কোতোয়ালির জিন্দাবাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের নেই পাকা ভবন ও খেলার মাঠ। টিন শেডের আধাপাকা একটা বাড়ির ছোট ছোট তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে পাঠদান চলে। বৃষ্টি হলে কক্ষ ভিজে যায়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শিল্পী খাতুন  জানান, ‘শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে গাদাগাদি করে বসতে হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে এখন আছে মাত্র ৭২ জন। শিক্ষক আছেন পাঁচজন।’ পাকা ও স্থায়ী ভবন নির্মাণ করতে কয়েকবার আবেদন করা হলেও তাতে কাজ হয়নি বলে তিনি জানান।

সূত্রাপুর ও কোতোয়ালি এলাকার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা বেশি বেহাল। রোকনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনটি জরাজীর্ণ। এর পাশে দুই কক্ষবিশিষ্ট পিডিবির একটি নতুন ভবনে একই সঙ্গে পাঠদান ও দাফতরিক কাজ চলে। মাদারটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বাজারসংলগ্ন বলে এর সামনে প্রায় সব সময় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। এ এলাকার আহম্মদবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে একটি ডোবা। এর থেকে প্রচ- দুর্গন্ধ ছড়ায়। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও ভারি করে তোলে দুর্গন্ধ। বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ের মাঠে পানি জমে যায় বলে জানায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইমন খান।

অনুসন্ধান বলছে, ডেমরার সারুলিয়া, কামারগোপ, কোতোয়ালির মাহুতটুলী রেনেসাঁ, ছোট কাটরা, হযরত নগর ও চম্পাতলী, গোয়ালঘাট, লালচাঁন ও পাড়া ডগাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার সার্বিক পরিবেশও নাজুক।  ভবন পুরনো, খেলার মাঠ না থাকাসহ শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশের সংকট হওয়ায় অনেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানকে পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন না।’

আবার ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আমিনউদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ও ঢাকা ১০ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস যৌথভাবে উদ্বোধন করেন। বিদ্যালয়টিতে পাঠদান শুরু হয় পরের বছর ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা একেবারে হাতেগোনা। সব শ্রেণি মিলিয়ে আছে মাত্র ৩৫ জন। জুরাইন বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ তুলনামূলক অনেক উন্নত। তবে এ বিদ্যালয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা নেই বলে জানান শিক্ষক আসাদুজ্জামান। মিরপুরের সরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সেনপাড়া পর্বতা। আড়াইতলার বর্গাকৃতির ভবনটির সামনে একটি খেলার মাঠও আছে। ১৯ জন প্রশিক্ষিত শিক্ষক আছেন। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করলেও সন্তানকেও নিজের বিদ্যালয়ের বদলে পড়াচ্ছেন বেসরকারি অন্য বিদ্যালয় ও কিন্ডার গার্টেনে। এরকম ১০জন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘শুধু শিক্ষকের সংকট নয়, সরকারের জবাবদিহি ও সুষ্ঠু পরিচালনা নীতির অভাবে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান একেবারে নি¤œমুখী। এসব বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ঝামেলা পোহাতে হয়।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক কর্মকর্তাও রাজধানীর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জীর্ণদশা ও এসব বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর মানসম্পন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তির ঝামেলার বিষয়টি স্বীকার করেন। মন্ত্রণালয় জানায়, ঢাকার প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার উন্নয়নে ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নবীনগর, ইপিজেড, ধামরাই, পূর্বাচল, হেমায়েতপুর, জোয়ারসাহারা, সাইনবোর্ড, চিটাগাংরোড, শাহজাদপুর ও ঝিলমিল এলাকাগুলোতে ১০টি বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। চলতি সময় থেকে জুন ২০১৯ মেয়াদে বিদ্যালয় ১০টি স্থাপন হবে ৬৭৪ কোটি টাকা খরচে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সরকারি মাধ্যমিক-১) সমীর কুমার বিশ্বাস জানান, ‘দশটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে প্রান্তিক শিক্ষার্থীর সুযোগ-সুবিধা থাকবে।’

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

শেষ তিন মাসে প্রাথমিকে ৩০ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

ডেস্ক: গত ২০১৬ সালের শেষ তিন মাসে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক শাস্তি ও যৌন হয়রানির অভিযোগে সারা দেশে ৩০ জন শিক্ষ-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক শাস্তির ঘটনায় ২৮ জনকে, মানসিক ১ জনকে ও যৌন হয়রানির অভিযোগে একজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় মামলা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত, বদলি প্রভৃতি শাস্তি দেয়া হয়।

গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি প্রদানসংক্রান্ত এই সমন্বিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) সঞ্জয় কুমার চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বুধবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনের তথ্যগুলো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ভুক্ত মাঠপর্যায়ের অফিসগুলো থেকে নেয়া হয় বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা শাস্তি পেয়েছেন। পাঁচজন করে শাস্তি পেয়েছেন ঢাকা ও সিলেট বিভাগে। এ ছাড়া বরিশাল, খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

জেলাভিত্তিক সবচেয়ে বেশি শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে লক্ষ্মীপুর ও সুনামগঞ্জে। লক্ষ্মীপুরে দুটি স্কুলের পাঁচজন এবং সুনামগঞ্জে তিন স্কুলের চারজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নেয়া হয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

ঢাকা বিভাগের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা হলেন- নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ১০ নং ধন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌস (সাময়িক বরখাস্ত), ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার ভাটিলক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলজার হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত), একই জেলার নগরকান্দা উপজেলার কোদালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজানুর রহমান (সাময়িক বরখাস্ত), ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার রৌহ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দীন (১টি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত), টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার পোস্টকামুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল করিম (বদলি)।

চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তিপ্রাপ্ত যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নাম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তারা হলেন- চট্টগ্রামের পাহাড়তলি উপজেলার দক্ষিণ কাট্টলী প্রাণহরি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ইশরাক আহমেদ (চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে বদলির জন্য প্রতিবেদন), একই উপজেলার সারাইপাড়া হাজী আব্দুল আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল মোস্তফা (প্রশাসনিক বদলির সুপারিশ), লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ঈদগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রেহানা আফরোজ (সতর্কতা) ও রাহেনা আক্তার (বিভাগীয় মামলা রুজু), লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার প্রতাপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা পুতুল রানী সাহা (সতর্কতা), অর্চনা রানী সাহা (সতর্কতা), জয়শ্রী রানী মজুমদার (সতর্কতা), চাঁদপুরের সদর উপজেলার কে আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শাহজাদী সাবিহা আক্তার (১টি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত), হাজিগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিত্য লাল দেবনাথ (১টি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত), ফরিদগঞ্জ উপজেলার শ্রীকালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দীন (তিরস্কার), রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার পুলিপারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্পদ কর (বিভাগীয় মামলা রুজুর জন্য প্রতিবেদন), বরকল উপজেলার বরকল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক লক্ষ্মীনাথ চাকমা (বিভাগীয় মামলা রুজুর অনুমোদনের নথি প্রেরণ), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মুক্তা রানী কর (বিভাগীয় মামলা রুজু), একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কনক চন্দ্র দাস (বিভাগীয় মামলা রুজু), সেনবাগ উপজেলার জয়নুল আবেদিন ফারুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অলি উল্লাহ (১টি ইনক্রিমেন্ট ২ বছরের জন্য স্থগিত)।

বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ধাউড়াভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল লতিফ (তদন্ত চলমান)।

সিলেট বিভাগের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা হলেন- সিলেট জেলার গোয়াইনঘা্ট উপজেলার উপরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আমিনা বেগম (অন্য বিদ্যালয়ে বদলিসহ বিভাগীয় মামলা রুজু), সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতিকুল ইসলাম (সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা রুজু), কুমনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আশিকুর রহমান (কারণ দর্শানো ও বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন), সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পৈন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আলী হোসেন (বিভাগীয় মামলা রুজু), জগন্নাথপুর উপজেলার বাগময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. ফরিদ উদ্দীন (বিভাগীয় মামলা রুজু)।

রংপুর, খুলনা ও রাজশাহীর ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তিপ্রাপ্ত যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নাম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তারা হলেন- রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার পারকুন্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. রেজাউল করিম (বদলি), উলিপুর উপজেলার মহিদেব (নব) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম (সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা রুজু), খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার ফকিরহান উপজেলার জারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা খাদিজা আক্তার (কৈফিয়ত তলব), রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার চটমোহর উপজেলার রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহিনুর রহমান (বদলি)।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির বিষয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল অ্যাইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) একটি বুকলেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। কিন্তু আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, ভয় দেখিয়ে নয় ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে। বাচ্চাদের সামনে নেতিবাচক শৃঙ্খলা নয়, ইতিবাচক শৃঙ্খলা দেখাতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক শাস্তি বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে ২০১০ সালের ৯ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের প্রতি সঠিক আচরণ বা ব্যবহারের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে জারি করা একটি পরিপত্র।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

একজন ভাইস-চ্যাঞ্জেলরের খোঁজে এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ

ড. আহমেদ ইমতিয়াজ: ১. আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের জন্য জব স্যাটিসফ্যাকশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকতা পৃথিবীর যে কোনো দেশেই অতিমর্যাদা ও সম্মানের। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকরা এমন বিছু কর্ম করছে (রাষ্ট্র মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় আনপ্রোডাকটিভ কর্ম করতে পরোক্ষভাবে বাধ্য করা হচ্ছে) যাতে কিনা অনেক সময়ই তাঁদের মর্যাদা ধুলোয় মিশে যায়। বিদেশে আমাদের অনেক শিক্ষককে অর্থের লোভে আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ ছুড়ে ফেলে নি¤œ শ্রেণির কাজ ও জীবিকা গ্রহণে কুরুচি দেখে অনেকবার স্তম্ভিত হয়েছি। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার রাবি প্রতিনিধি জনাব মর্তুজা নূর “পিএইচডি করতে গিয়ে ফিরছেন না শিক্ষকরা” শিরোনামে একটি খবর ছেপেছে (২২/২/২০১৭)। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৪ জন শিক্ষক বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। রাবি থেকে গৃহীত বেতন-ভাতা ১০% সুদসহ ফেরত দেবার কথা থাকলেও ১৬ জনের নিকট থেকে এখনও অর্থ ফেরৎ পাওয়া যায়নি। প্রফেসর অরুণ কুমার বসাক স্যারের বরাত দিয়ে মূলত মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন না থাকায় ব্রেইন ড্রেইন এর বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যাঁরা বিদেশে ডিগ্রী করতে গিয়ে আর ফেরেননি তাঁদের নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ-এর ‘তাঁরা ফেরেন নাই’ লেখাটিও একই ধরনের ছিল যা আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে (প্রথম আলো, ৪/১০/২০১১)। জনাব আবুল মকসুদ এর ভাষায় “তাঁদের (শিক্ষকদের) কোনো রেস্তোরাঁয় কিচেনে বসে তরকারি কুটতে, পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে, রাস্তায় গাড়ি মুছতে, কোনো বদমেজাজি বুড়ির বাগানের ঘাস সাফ করতে, কোনো সাহেবের ঘোড়ার ঘাস কাটতে, সপ্তায় ৫ বাড়িতে ৫ দিন গিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করতে, কোনো নিঃসঙ্গ বুিড়র ৪/৫টি কুকুরকে সকালে-বিকেলে পায়খানা করিয়ে হাওয়া খাইয়ে আনতে, কোনো ডিপার্টমেন্ট স্টোরে লরি থেকে মাল নামিয়ে ট্রলিতে করে ঠেলতে অরুচি নেই”। এই যদি সম্মানিত শিক্ষকদের রুচি হয় তবে জাতীয় রুচি ও মর্যাদার ঝাণ্ডা উড়াবে কে? যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় গর্ববোধ করে, নিজেকে অ্যারিসটোক্র্যাট বা এলিট সোসাইটির সদস্য ফলায় অথচ গভীর রাতে অন্ধকারে হকার সেজে বাড়ি বাড়ি পত্রিকা দিতে, কুলি হয়ে ট্রাক লোড/আনলোড করতে, কোনো জিমে/স্টেডিয়ামে ক্লিনিংয়ের কাজ বা চেয়ার-টেবিল গোজগাছ করার মতো কাজ পেতে লবিং করে তাদের পারিবারিক বড়াই তথা রয়ালিটি একেবারেই বেমানান। উর্দিতে শতেরটি বোতাম থাকলে বুঝি উনি চৌকিদার। কিন্তু শিক্ষক চেনার উপায় কী? সকাল দুপুর সন্ধ্যা আর আলো আধারের কর্ম-আয়ে যে শি¶ক (সব শিক্ষক নয়) গিরগিটির মত রং বদলায় তাঁদের শ্রেণিচরিত্র বুঝবো কেমনে? অনেকেই বলতে পারেন কোনো কাজই ছোট না। আমিও তাদের সাথে একমত। একজন প্রফেসর বা প্রকৌশলী তার নিজের গাড়ি নিজে চালানোতে মোটেও দোষ নাই কিন্তু তাঁদের দ্বারা ট্যাক্সি চালানো এক ধরনের অপচয় (brain waste)। অপকর্মও। অবসরে নিজের বাগানের ঘাস নিজে পরিস্কার করে ফুলগাছে পানি দেওয়া গেলেও অন্যের বাগানে মালীর চাকরি করা যায় না। যে শিক্ষক/কর্মকর্তা বিদেশে ওসব কাজ করেন তারা কিন্তু নিজ দেশে গেলে তা গোপন করবেন। যে কর্মের কথা অন্যকে বলা যায় না তাই এক ধরনের অপকর্ম। এই লুকোচুরির মধ্যেই বিচ্যুতি ও অবিচারের গন্ধ। মানুষের কর্মকর্তা যদি সীমাহীন না হয়ে থাকে তাহলে আয়মূখ্য অতিরিক্ত কর্মযজ্ঞের ক্ষতিকর প্রভাব প্রধান দায়িত্ব-কর্তব্য শিক্ষা-গবেষণাকে কোনো না কোনো ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবেই। তাই শিক্ষক বা অন্যান্য দায়িত্বশীল পদে কর্মরত (দেশে বা বিদেশে) মানুষের আত্মসম্মান ও লজ্জাবোধ যথার্থভাবে জাগ্রত হবে সেটাই দেশবাসীর কাম্য।

২. মার্চ ২০, ২০১৭ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস-চ্যাঞ্জেলর (ভিসি) প্রফেসর ড. মু. মিজানউদ্দিন এর দায়িত্বকাল শেষ হবে। কেমন চালিয়েছেন প্রফেসর মিজানউদ্দিন তা নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা হতে পারে। অন্যান্য ভিসিদের মতো কিছুটা সফলতা ও খানিকটা ব্যর্থতা নিয়েই শেষ করতে যাচ্ছেন তাঁর মেয়াদকাল। সফলতা-ব্যর্থতার সমালোচনা আবার সরকার দলীয়দের কাছে একরকম এবং অদলীয় আম জনতার স্তরে থাকা সাধারণ শিক্ষকের কাছে অন্যরকম। সুবিধাবাদী ও অসুবিধাবাদীদের কাছেও বিশ্লেষণটা ভিন্নতর। আর ভিন্ন পথের লোকদের তো ভিন্ন মত থাকবেই। সর্বপরি একাডেমিক বিষয়ে একটি জটিল কাজের জন্য শিক্ষকদের মধ্যে আম জনতার কাতারে থাকা সত্তে¡ও বর্তমান ভিসি মহদয়ের সাথে একবার সাক্ষাত পাওয়ার সুযোগ জুটেছিল। তাতে মানুষ হিসাবে উনাকে অতটা ভিনডিকটিভ মনে হয়নি যতটা কানকথায় রটেছে। বরং বিভাগীয় সভায় আমার বিষয়টিকে যতটা কমপ্লে· স্ট্রাকচার দেয়া হয়েছিল তার চেয়ে অনেক সহজতর সমাধান তিনি দিয়েছিলেন। এই হিসাবে আমার কাছে তিনি কিছুটা অতিরিক্ত ধন্যবাদ ও সম্মান সবসময়ই পাবেন। যাইহোক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের যে বিধি সম্মত পদ্ধতি তা আমরা বহুদিন দেখিনি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রক্রিয়াটি জীবন্ত জীবাশ্মের মতো কোনো মতে টিকে আছে। যারা নিয়মগুলো সৃষ্টি করেছেন তারাই ওগুলোকে অকেজো কাগজের মর্যাদা দিয়ে মিউজিয়ামে স্থান পাবার মতো নগন্য বিষয়ে পরিণত করে বিকল্প পদ্ধতিটি বিশেষ স্বার্থে চালু রেখেছেন। ওসব নিয়ে খুব বেশি কথা বললে অনেকে প্রত্বতত্ববিৎও ভাবতে পারেন। আসলে এখন সময়ই চলছে অনির্বাচনের। অনির্বাচিত ফটোকপির ভিসি-র শাসন ও সংস্কৃতিতে আমরা অনেকটা অভ্যস্ত। যেমন অভ্যস্ত তরতাজা ফ্রেশ গাছপাকা সিদুরে আমের পরিবর্তে প্রিজারভেটিভ মিশ্রিত ম্যাংগো জুসে! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রাবি-তে সামনে যে ভিসি মহোদয় আসবেন তিনিও টেকনোক্র্যাট ভঙ্গিমায় ফটোকপির বলেই হবেন। তবে স্বাধীনতার মাসে রাবি-তে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সাধারণ জনগণের তথা অধিকারের স্বাধীনতা টিকে থাকবে নাকি গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি (চ্যাঞ্জেলর) কর্তৃক বঙ্গভবনের ক্ষমতার স্বাধীনতা টিকে থাকবে সেটা দেখার জন্য আরো কয়েকদিন বেঁচে থাকার আকাংক্সখা রইল। অনির্বাচিত ভিসি স্বভাবতই শিক্ষকদের মতামত হরণ করে শিক্ষা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের স্থান থেকে সরিয়ে দলবাজদের গারদ বানানোর কৌশল বৈই অন্যথা নয়। কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত কিছুদিন যাবৎ রাবি-র সকল গেইটে তালা লাগিয়ে বাস সার্ভিস বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের প্রতিষ্ঠান বানানোর যে মহড়া দেখেছি এসব তারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, অনির্বাচিত ভিসি মানেই এমন লোকের আবির্ভাব সরকার তথা দলের কথা শুনলেই যাদের মেরুদণ্ড পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী কোণে সামনের দিকে বেঁকে যায়। নেতাদের দেখলেই যাদের লেজ নাড়ানো শুরু হয়ে যায়! ভিন্নমতের সহকর্মী ও সমর্থকদের দমিয়ে রাখার জন্যও প্রতিভাসম্পন্ন (!) ওইরকম দল/নেতাপ্রিয় নির্ভিক ব্যক্তির দরকার হয়। সঙ্গত কারণেই এমন বিশেষ উপায়ে খুঁজে পাওয়া ব্যক্তি মানেই অ-একাডেমিক, অগবেষক এমনকি প্রশাসনিক কাজে অদক্ষ বাঙ্গালির আবির্ভাব।

৩. সততা, যোগ্যতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি গুণসমূহ দিনে দিনে অদামি অপদার্থ বিষয়ের দিকে বিবর্তন হচ্ছে। গুণবাচক অধিকাংশ শব্দসমূহের প্রায়োগিক অর্থ ক্রমশ বিলুপ্তির পর্যায়ে। ‘সত্যদা একজন ভালো মানুষ’ এর অর্থ তিনি একজন অকেজো অপদার্থ মানুষ! যদি তাই না হবে তবে সরকার ফ্যা·পত্রের মাধ্যমে যে ভিসি নিয়োগ দেয় কেনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল ও স্বার্থক শিক্ষক-গবেষকদের তালিকায় তাঁর নাম থাকে না। কেনো বর্বর সমাজের মতো বুদ্ধির জোরকে গলা ও গায়ের জোরের কাছে বারবার হার মানতে দেখতে হয়? কেনো মনন ও সৃষ্টিশীলতাকে দমিয়ে লবিংকে প্রিফার করা হয়? সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি মুক্ত থাকার পরামর্শ দেয় অথচ ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্লাব মাতানো দুর্বল প্রোফাইলের স্বভাবে অশিক্ষক কর্মে অগবেষক শ্রেণির লবিংপ্রিয় আনএডমিনিসস্ট্রাটিভ প্রফেসরদের প্রাধান্য দেখা যায়। ফলে কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা, সততা, যোগ্যতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি অন্ধকারে গুমরে মরে। অফুরন্ত কালো টাকার মালিক, মানুষের সীমাহীন ক্ষতি করার সামর্থবান ব্যক্তি, অসীম প্রতাপশালী এবং ভোগবিলাসীরাই জনগণের কাছে সফল ও স্বার্থক হোমো সেপিয়ান হিসাবে পরিগণিত হওয়ার জন্য যা কিছু দরকার রাষ্ট্র যেন তাই করছে। এত কিছুর পরেও আমরা নিরাশ হবো না। নিভে যাব না। সরকার আমাদের অনেক আশারবাণী শুনাচ্ছে, বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আমরা সরকারের প্রতি ভরসা রাখতে চাই। হোক অনির্বাচিত তবুও সরকার একজন সুযোগ্য শিক্ষককে ভিসি নিয়োগ দিবে যাঁর গ্রহণযোগ্যতা আছে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রধান হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উভয় কার্যকর্মের মধ্যে ইনটিগ্রেটি বজায় রেখে তা এক্সিকিউট করার মতো মেচুউরিটি আছে। নীতিবান ও ডেডিকেটিভ মানুষ হিসাবে শ্রদ্ধেয়, একাডেমিশিয়ান হিসাবে প্রাজ্ঞ, গবেষক হিসাবে বিখ্যাত, শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসক হিসাবে পরিক্ষিত। ভিসি আর সিইসি বিষয় দু’টি সম্পূর্ন ভিন্নতর। সিইসি-র ব্যাপারটা যতটা না শ্রদ্ধার তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস ও আস্থার। কিন্তু একজন ভিসিকে হতে হয় প্রথমত সম্মান ও শ্রদ্ধার অতঃপর বিশ্বাস ও আস্থার। শিক্ষার্থীরা যখন দেখবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি একজন সৎ মানুষ, ভালো শিক্ষক, খ্যাতিমান গবেষক, বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের প্রতিনিধি এবং পাণ্ডিত্ব সম্পন্ন তখন অমন ব্যক্তি হওয়ার ¯^প্ন পুরণের জন্য তারা তাদের শিক্ষকের পদাংক অনুসরণ করবে বৈকি। পিএইচডি ডিগ্রী ছাড়া একজন শিক্ষক কীভাবে ভিসি হোন তা মাথায় আসে না। আমার জানা মতে চট্রোগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ভিসি বর্তমানে ইউজিসিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এমন ব্যক্তির পিএইচডি ডিগ্রী নাই (তথ্যটি অসত্য হলে দুঃখিত)। রাষ্ট্রের যে টেরিটোরিতে উন্নত দেশের বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পিএইচডি ও পোস্ট পিএইচডি করা প্রফেসরের প্রাচুর্য সেখানে পিএইচডি বিহীন ব্যক্তিকে তাদের কর্তা বানানোর প্রথাটি নিশ্চয়ই কোনো অপ্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনায় করা হয়ে থাকে। অবশ্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাঁর নিজের সম্পর্কে পর পর যে উপভোগ্য ভাষণ শুনিয়ে চলেছেন তাতে যুবসমাজ লেখাপড়া করে সময় ও মেধা নষ্ট করবে কি-না তা গবেষণার নতুন প্রসংগ হতে পারে। যাইহোক, এভাবে ভিসি নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের ভিশন সফল হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এগিয়ে চলার মিশন অপূর্ণই রয়ে যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের বর্তমান চিত্র তারই জীবাশ্ম। হ্যাঁ বলতে পারেন সত্যেন বোসের তো পিএইচডি ছিল না। ডিগ্রীর প্রয়োজন যদি না ই থাকবে তবে ড. মু. শহীদুল্লাহ, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. মু. কুদরাত-এ খুদা, আচার্য্য প্রফুল্ল রায় প্রমূখদের বিদেশি ডিগ্রী কি নিতান্তই শখ তামাশা ছিল? বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার জন্য বিশ্বব্যাপি পিএইচডি ডিগ্রীর যে আবশ্যকতা তা কি শুধুই অপচাহিদা? রাজনৈতিক বিবেচনায় এভাবে ভিসি নিয়োগ করা হয় বলেই উনাকে পাড়ার নেতার ইশারায় চলতে হয়, ভিসির সাথে সাক্ষাত করতে একজন প্রফেসরকে ২/৩ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলেও ওয়ার্ড কমিশনাররা কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই বীরদর্পে আসা যাওয়া করে, শিকক্ষ নিয়োগে মেধা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে দলীয় প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পুলিশ, বিজিবি বা আর্মিতে তাদের ঊর্ধ্বতনকে সম্বোধন করার অফিসিয়াল টার্ম/ভাষা আছে। বিসিএস কর্মকর্তারাও তাঁর সিনিয়রকে নির্দিষ্ট শব্দ প্রয়োগে এড্রেস করে অথচ সর্বোচ্চ শিক্ষিত ও পদাধিকারী একজন প্রফেসর/শিক্ষককে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লার্ক বা কর্মচারীরা ভাই/চাচা বলে সম্বোধন করে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, টিভি, মোবাইল কোম্পানি, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল ও বাস মালিকরা রমরমা ব্যবসা নিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলছে অথচ দেশ ও জনগণের সম্পদ গরীব মেধাবী ছাত্রদের আশ্রয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতাসীনদের দাপটে ধ্বংস প্রায়।

৪. বিদেশ বিভুঁইয়ে নিজেকে, নিজের দেশকে এমনকি আমাদের আচার-আচরণকে অন্যের সাথে তুলনা করে আমাদের হীনতা, দীনতা, নষ্টামি, ভ্রষ্টামি তথা সীমাহীন অবস্থায়-অধঃপতন ধরা পড়েছে। জীবন, রক্ত ও ইজ্জত হারিয়ে যে দেশ আমরা পেয়েছি তার পাসপোর্টটি প্রায়শই অসহনীয় বিড়ম্বনা ও গ্লানির কারণ হয়েছে। সভ্য সমাজে পদে পদে নিজেকে অসভ্য-বর্বর সমাজের উপাদান মনে হয়েছে। সেই অসহনীয় উপেক্ষা থেকে মনের গহীনে বারবার রং বদলানোর স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে। সেই স্বপ্নে স্বেচ্ছাচারিতা ছিলনা বরং স্বাধীনতা ছিল। প্রতিটি মানুষ/জীব তার নিরাপত্তার জন্য স্বাচ্ছন্দের পরিবেশে যেতে চায়। তাতে কোনো অন্যায়ও হয়তো হতো না। না ফেরার বিপক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ছিলনা, আইনও নাই। বরং আছে শাসক শ্রেণির সীমাহীন অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা আর ব্যর্থতা। যে মানুষ বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে কাজ করতে পারে সে দেশে ফিরে অচল অকেজো হয়ে যায়। এটা চলার দোষ? নাকি চালকের দোষ? তবুও দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর কাক্সিখত স্বপ্ন নিয়েই অনেক শিক্ষক বিদেশে উচ্চ বেতনের অফার এবং নিরাপদ জীবন যাপনের সুযোগ মাড়িয়ে স্বদেশে ফিরেছেন। কিন্তু সেই কাক্সিখত স্বপ্ন পুরনের জন্য হয়তো আরোও বহুকাল অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের।

লেখক:

ড. আহমেদ ইমতিয়াজ

সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ, রা.বি.।

E-mail: imtiaz269@yahoo.com

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সরকারি নিয়োগ ইংরেজি ভাষায় বিসিএস কেন?

ডেস্ক : বাংলাদেশের সংবিধানে লেখা আছে: প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ১৯৮৭ সালের বাংলা প্রচলন আইনে বলা হয়েছে, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম বাংলায় হতে হবে। বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করা হলে সেটা বেআইনি ও অকার্যকর গণ্য হবে।

যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ আইন অমান্য করেন, তবে তিনি অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সরকারি কর্মকমিশন ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষা ইংরেজিতেও নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের প্রশ্ন: এই সিদ্ধান্ত কি প্রথমত সংবিধান এবং দ্বিতীয়ত বাংলা প্রচলন আইনের পরিপন্থী নয়? পৃথিবীর কোনো দেশে কি রাষ্ট্রভাষা ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়ার উদাহরণ আছে? জাপান, জার্মানি, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে রাষ্ট্রভাষার জন্য কোনো আন্দোলন হয়নি, কিন্তু জাপানি, জার্মান বা রুশ ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম চালানোর কথা কি ভাবা যায় এসব দেশে?
সরকারি কর্মকমিশন স্বীকার করেছে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই দ্বৈত বিসিএসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম কেন ইংরেজিই হতে হবে?’ অথবা ‘ব্যবসায়, বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয় কেন ইংরেজিতেই পড়তে হবে?’এসব সংগত প্রশ্নে আমরা যাচ্ছি না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার ছাগল লেজে কাটবে, নাকি মাথায় কাটবে, সেটা তার ব্যাপার।কিন্তু আগামীকাল যদি মাদ্রাসাগুলো দাবি করে যে বিসিএস পরীক্ষা আরবি-উর্দু-ফারসিতেও নিতে হবে, তখন কমিশন কী উত্তর দেবে? ইংরেজি বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা নয়।ঔপনিবেশিক কারণে বাংলাদেশে ইংরেজির যদি একটি বিশেষ স্থান সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে ধর্মীয় শিক্ষাগত কারণে আরবি-উর্দু-ফারসিরও একটি বিশেষ স্থান সৃষ্টি হয়েছে।হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি, যেখানে আরবি বহু হাজার মাদ্রাসার শিক্ষার মাধ্যম।

ভাষার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জনগণের উন্নয়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।বাংলা ভাষার অবমূল্যায়নের সমান্তরালে বাংলাভাষী মানুষেরও অবমূল্যায়ন হবে।ইংরেজি না জানার কারণে নীতিনির্ধারণে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা থাকবে না

বাংলাদেশ সরকারের চাকরি করতে চাইবে বাংলাদেশের একজন নাগরিক অথচ সে রাষ্ট্রভাষা বাংলা শুদ্ধভাবে লিখতে, পড়তে, বলতে জানবে না—এমন সৃষ্টিছাড়া আবদার শুধু শিবঠাকুরের আপন দেশেই সম্ভব।বাংলা জানে না বলে যে ব্যক্তি ইংরেজিতে বিসিএস পরীক্ষা দিতে বাধ্য হচ্ছে,

সে কীভাবে প্রশাসনে বাংলা ব্যবহার করবে? প্রশাসন যেহেতু তার বাংলা না জানা মেনে নিয়েই তাকে নিয়োগ দিচ্ছে, সেহেতু বাংলা ব্যবহারে তাকে বাধ্য করার নৈতিক অধিকার প্রশাসনের থাকবে না।এর ফলে প্রশাসনে বাংলা প্রচলনে ইতিমধ্যে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে,সেটুকুও অনতিবিলম্বে হারিয়ে যাবে।
ইংরেজি ভাষায় বিসিএস পরীক্ষাকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে, প্রশাসনে যথেষ্ট ইংরেজি জানা লোক নেই।একসময় ইংরেজি কম জানার অজুহাতে পররাষ্ট্র বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে এবংপ্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের আর নেওয়াই হবে না।কালক্রমে আমলাতন্ত্রে ‘ইংরেজি’ এবং ‘বাংলা’—এই দুটি গোষ্ঠী সৃষ্টি হবে এবং দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে রেষারেষি শুরু হবে।এই প্রতিযোগিতায় ‘বাংলা’ আমলারা পরাজিত হবেন।কারণ বাংলা সাবান, বাংলা বাড়ি, বাংলা মদ, বাংলা ভাই, বাংলা সন ইত্যাদি বাংলা যেকোনো কিছুকে বাঙালিরা সাধারণত কিছুটা অবজ্ঞার চোখেই দেখে থাকে।
বিসিএস পরীক্ষায় ইংরেজি পেপারে যারা বেশি নম্বর পাবে, তাদের নিয়োগ দিয়ে ইংরেজি জানা লোকের ঘাটতি মেটানো যেতে পারে।ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত আমলাদের জন্য কথ্য ও লেখ্য ইংরেজি ভাষা কোর্সের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা কোনো সমস্যার সহজ সমাধানে আগ্রহী নন।পরবর্তী প্রজন্মকে ইংরেজি শেখানোর জন্য ইংলিশ মিডিয়ামের অনুমতি দিয়ে তাঁরা অতীতে একটি ভুল করেছিলেন। এবার চোস্ত ইংরেজি জানা আমলা সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইংরেজিতে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে তাঁরা আরও একটি ভুল করতে চলেছেন।
নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ইংরেজিতে বিসিএস চালু হলে বাংলা মিডিয়াম এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব ধাপে ধাপে কমে আসবে। অভিভাবকেরা সামর্থ্য থাকলে ছেলেমেয়েদের বাংলা মিডিয়াম স্কুলে আর ভর্তি করতে চাইবেন না।বাংলা না শিখে যদি চলে, তবে সন্তানদের বাংলা শেখানোর ঝামেলায় বা তারা কেন যেতে চাইবেন? একসময় দেখা যাবে, পারতপক্ষে বাংলায় আর কেউ বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে না। সবাই ইংরেজিতে পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রশাসনের চৌকস আমলারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি এবং জনগণের সঙ্গে বাংরেজি বলবেন।ইংরেজি শব্দবহুল এবং ইংরেজি উচ্চারণে বলা বাংরেজি চেপে বসবে সমাজের সর্বত্র, কারণ সেই উপভাষাটিকে তখন বেশি ফ্যাশনেবল মনে হবে।আদালতে এবং শিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সম্ভব হয়নি।ধীরে ধীরে প্রশাসন, ব্যবসায় এমনকি সংস্কৃতিতেও বাংলার ব্যবহার হ্রাস পাবে।বিচিত্র ব্যবহার না হওয়ার কারণে বাংলার প্রকাশশক্তি এতটাই হ্রাস পাবে যে একসময় বাঙালিরাই বিশ্বাস করবে না, বাংলা সর্বস্তরে ব্যবহারের উপযুক্ত কোনো ভাষা। আফ্রিকার অনেক দেশে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।রুয়ান্ডার হুতু ও তুতসিরা ভাবতেও পারে না যে ফরাসিকে বাদ দিয়ে তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা কিংবা আদালতে বিচারকার্য পরিচালনা করা সম্ভব।
ভাষার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জনগণের উন্নয়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।বাংলা ভাষার অবমূল্যায়নের সমান্তরালে বাংলাভাষী মানুষেরও অবমূল্যায়ন হবে। ইংরেজি না জানার কারণে নীতিনির্ধারণে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা থাকবে না।ইংরেজি না-জানা বাঙালিদের উত্তরপুরুষেরা একসময় ইংরেজি শিখে আবার ক্ষমতাসীন হবে ঠিকই, কিন্তু তত দিনে অনেকগুলো প্রজন্ম হারিয়ে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে অনেকখানি সময়। অন্যান্য জাতি ইত্যবসরে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে এবং বাঙালিরা তখনো ভিন জাতির দেশে গিয়ে কামলা খেটে খেটে শরীর ও মেধার অপচয় করতে বাধ্য হবে।
উত্তরপুরুষদের অর্থনৈতিক সৌভাগ্যের আশায় ’৪৮-৫২ সালে ভাষাশহীদেরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সালাম-রফিক-বরকতের যাবতীয় অর্জন অচিরেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে একদিন স্মৃতির বিষয়ে পরিণত হবে।ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিদ্যু একবার বলেছিলেন: ‘ফরাসি ভাষার প্রশ্নে আমরা যদি ছাড় দিই তবে আমরা একেবারে ভেসে যাব।’রক্তের দামে কেনা রাষ্ট্রভাষার অধিকারের প্রশ্নে আমরা যদি সদা সতর্ক না থাকি, তবে আমাদেরও পায়ের তলার মাটি সরে যাবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
শিশির ভট্টাচার্য : অধ্যাপক, আধুনিক ভাষাশিক্ষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে বিতর্ক, সমাধান খুঁজতে হবে শিগগির

শেখ আদনান ফাহাদ,৬ মার্চ ১৭: বাংলাদেশে হেন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে বিতর্ক নেই। ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে, নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে পর্যন্ত বিতর্ক আছে। নানা বিতর্ক নিয়েই বাংলাদেশ এগুচ্ছে। বিপদজনক বিষয় হল,নতুন প্রজন্ম জাতীয় নানা ইস্যুতে ঐকমত্যে আসতে পারছেনা। প্রজন্ম যদি বিরোধ নিয়ে বড় হয় তাহলে জাতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হতে পারেনা। পুরনো হলেও নতুন করে সামনে এসেছে সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যু।

বিশেষ করে, দৃষ্টিকটু এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক চলছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সম্প্রতি মানববন্ধন করেছে। কোটা পদ্ধতিতে যে কোনো সংস্কারের  বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই সন্তানরা।

২০১০ সালে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট পদ সংরক্ষণ করতে হবে। পরের বিসিএসের মাধ্যমে এই শূন্যপদ মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে। কিন্তু পরের বিসিএসের মাধ্যমেও মুক্তিযোদ্ধা কোটার শূন্যপদ পূরণ করা যায়নি। কিছু পদ দীর্ঘদিন শূন্য থেকেছে। তখন সরকারকে কোটা সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করার অনুরোধ করা হলে মন্ত্রিসভা শুধু একটি বিসিএসের জন্য কোটার শূন্যপদ সংরক্ষণ করার নিয়ম শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সম্প্রতি পিএসসির চেয়ারম্যান ড.সাদিকের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা। মানববন্ধন করে তারা ড. সাদিকের অপসারণের দাবি জানায়। অভিযোগ করা হয়, পিএসসির চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন!

বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য পদগুলো মেধা তালিকায় থাকা সাধারণ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ করা হবে মর্মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে পরিবর্তনের দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা।

মানববন্ধনে ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সুযোগ সংকুচিত করার কোনো সুযোগ নেই। ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা’ মেধাবী নন, নানা পর্যায়ে এমন ঢালাও পর্যবেক্ষণের বিষয়েও তীব্র প্রতিবাদ জানান।

পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক একটি জাতীয় দৈনিককে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদ সংরক্ষণ করার নিয়ম ৩৬তম বিসিএসের জন্য শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারণ শিথিল করা না হলে অনেক পদ শূন্য থেকে যাবে। বিশেষ করে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক ক্যাডারের পদ শূন্য থাকবে।

২৮তম থেকে ৩১তম এবং ৩৩তম থেকে ৩৫তম বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারগুলোর ক্ষেত্রে শূন্যপদের চেয়ে কৃতকার্য প্রার্থী বেশি থাকায় ওই সব ক্যাডারের মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় কোনো পদ খালি থাকেনি। কিন্তু কারিগরি ও পেশানির্দিষ্ট ক্যাডারের বিশেষ করে চিকিৎসা, কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, প্রকৌশল ও শিক্ষকতা ক্যাডারে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় পদের চেয়ে কৃতকার্য প্রার্থীর সংখ্যা কম ছিল। ফলে এসব কোটার সব পদ পূরণ করা যায়নি।

৩৬তম বিসিএসে দুই হাজার ১৮০টি শূন্যপদে লোক নিয়োগ করা হবে। এর লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফলাফল তৈরির কাজ চলছে। এ বিসিএসে চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, মৎস্য, পশুপালন ও শিক্ষকতা ক্যাডারের পদ এক হাজার ৬৩৮টি। এসবের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার ৪৯১টি (৩০ শতাংশ), নারী কোটার ১৬৪টি (১০ শতাংশ) ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ৮২টি (৫ শতাংশ) পদ রয়েছে। এই ৭৩৭টি পদের অধিকাংশই খালি থাকবে। ফলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা অধিদপ্তর কর্মকর্তার অভাবে পড়বে বলে সেই দৈনিকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

পত্রিকাটি জানায়, সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে পিএসসি বলেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থী কম থাকায় মেধা কোটার সব পদও পূরণ করা সম্ভব হয় না। মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদ সংরক্ষণের নিয়ম থাকায় কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের মুক্তিযোদ্ধা কোটার অপূরণকৃত পদ সাধারণ প্রার্থীদের মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা যায় না।

পিএসসিতে কথা বলে জানা গেছে,  সমালোচনা ও প্রতিবাদ হওয়ায় সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিষয়ে কোনো সংস্কারের পথে যাচ্ছেনা। আপাতত না হয় গেলনা। তাই বলে সামনের বিসিএস পরীক্ষাগুলোতে সরকার এই পথে যাবেনা এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায়না।  অথবা সরকার পরিবর্তন হলে এই কোটা বাতিল করা হবে না, তাও বলা যায়না। এ নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভেতরেই পক্ষ-বিপক্ষ আছে। যার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ আছে সে পক্ষে বলে, যার বাবার নেই সে মনে করে, সনদের জোরে কেউ কেউ বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। ফলে এক ধরনের বিরোধ নিয়ে প্রজন্ম বড় হচ্ছে। এই বিরোধ মোটেও কাম্য নয়। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক যে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানির কারণ হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা কেন বাড়তি সুবিধা পাবে? এমন প্রশ্ন অনেকে করেন। এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন। ফলে তাদের সন্তানরা একটু বাড়তি সম্মান, সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। বলা হয় যে মুক্তিযুদ্ধের সময় অল্পসংখ্যক রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ছাড়া সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধ এত সরল বিষয় না। যারা যুদ্ধ পরিকল্পনা করেছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ-অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন,  মুজিবনগর সরকারের হয়ে কোনো না কোনোভাবে কাজ করেছেন, সশস্ত্র যুদ্ধে যারা গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন বা গাজী হিসেবে বেঁচে আছেন, মুক্তিযোদ্ধা শিবিরগুলোতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, গায়ে গতরে কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন তারাই আসলে মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে যারা কাজ করেছেন, গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন, বেতার যোগাযোগ জারি রাখতে প্রকৌশল সেবা দিয়েছেন, যারা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা শিবিরগুলোতে রাজনৈতিক ইন্সট্রাক্টরের কাজ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে যারা রান্নাবান্নার কাজ করে খাবার যোগান দিয়েছেন সবাই মুক্তিযোদ্ধা। এখন প্রশ্ন হল, উপরোক্ত কাজগুলো কতজন করেছেন?

মুক্তিযোদ্ধারা খুবই স্পেশাল। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রাষ্ট্রে বেশিই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ৯ মাস বাড়ি-ঘর থেকে দূরে থাকায় কত পরিবার ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। যারা যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তাদের পরিবার তো পথে বসে গিয়েছিল। গাজী হয়ে যারা বেঁচে আছেন, তাদেরও অনেক পরিবারের দুর্দশা কাটতে অনেক সময় নিয়েছে। এখনো অনেক পরিবার দৈন্যদশায় আছে। এদেশে গরিব রাজাকার পাওয়া মুশকিল হবে। কিন্তু হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা মিলবে ভূরি ভূরি। ফলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করা, বাড়তি সুবিধা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এই সেনসিটিভ দিকটিরই ফায়দা নিয়েছে কিছু শিক্ষিত টাউট।  এদেশে সচিব পর্যন্ত, তাও আওয়ামী লীগের আমলে, ভুয়া সনদ বানিয়ে সুবিধা নিয়ে ধরা পড়েছেন। অনেককে দেখেছি, বাবা/চাচার জন্য সনদ ম্যানেজ করার জন্যই শুধু ক্ষমতাসীন নানা সংগঠনের সাথে জড়িত হয়েছেন। একসময় তো  সনদ বানানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাই নির্ধারণ করতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট আছে এদেশে! মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে বিতর্কের এগুলোও কিছু কারণ। এখন তো বলা হয়, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ দুই প্রকার- আসল এবং ভুয়া!

এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে হবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করে একটা স্থায়ী ডকুমেন্ট তৈরি করতে হবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা গেলে কোটা বিতর্ক অবসানে অনেকখানি আগানো যাবে বলে আমার ধারণা। কিন্তু কবে হবে, আওয়ামী লীগ গত ৮ বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায়। অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বিষয়ে তেমন কোনো অর্জন নেই। রাজাকার তালিকা তৈরির দাবিও অনেক দিনের। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।

তবে মুক্তিযোদ্ধা  বা রাজাকার তালিকার সাথে কোটা বাতিলের কী সম্পর্ক সেটা অবশ্য চট করে বোঝা সহজ নয়। একটু গভীরভাবে ভাবলে এ কথার মর্মার্থ অনুধাবন করা যাবে। কিন্তু কোটা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতেই হবে। কীভাবে করা হবে, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের ভাবতে হবে। কিন্তু প্রজন্মকে বিতর্কের মধ্যে ফেলে রাখা যাবেনা। এত অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস নিয়ে থাকা যায়না।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বইমেলার একাল-সেকাল: ‘মানসম্পন্ন বই অল্পই ভালো’

অমর একুশে গ্রন্থমেলার শুরু ১৯৭২ সালে, মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে। ওই বছর বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে চট বিছিয়ে কয়েকটি বই নিয়ে বসেছিলেন তিনি। পরের বছরগুলোতে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েকজন প্রকাশক। ১৯৮৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এই মেলা। তখন থেকেই বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয়ৈ আসছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ওই সময় ৫০-৬০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিত এই আয়োজনে। সময়ের পরিক্রমায় সেই মেলা এখন পরিণত হয়েছে জাতীয় উৎসবে। বাংলা একাডেমি চত্বরে স্থান জায়গা সংকুলান না হওয়ায় গত চার বছর ধরে মেলার পরিধি বাড়ানো হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সবার কাছে বইমেলা নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।
লেখক-প্রকাশকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ও পাঠক। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ওই সময়ের জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এই সময়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও বেড়েছে। কিন্তু ৩৫-৪০ বছর আগে যে প্রত্যাশা নিয়ে বইমেলার শুরু, তা শতভাগ পূরণ হয়নি বলে মনে করেন তারা। তাদের মতে, আগে বইমেলার যে গাম্ভীর্য ছিল তা এখন কমে এসেছে।
লেখক-সাংবাদিক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ  বলেন, ‘এখন প্রকাশকরা চায় সংখ্যা বাড়াতে, মান নয়। এখনকার বইমেলায় হুজুগের মতো করে বই বের হয়। আগে অল্প বই বের হলেও তা ছিল মানসম্পন্ন। এখন বইমেলায় অংশ নিতে নির্দিষ্টসংখ্যক বইও লাগে। কিন্তু অনেক যাচ্ছেতাই বইয়ের চেয়ে ভালো বই অল্পও ভালো।’

গত কয়েক বছরে বইমেলা ঘুরে দেখা গেছে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিণত হয়েছে উৎসবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বইমেলায় থাকে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও একুশে ফেব্রুয়ারির মতো দিনগুলোতে এই ভিড় পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
গতকাল মঙ্গলবারও (২১ ফেব্রুয়ারি) বইমেলা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল মেলায়। অনেকেই এসেছিলেন সপরিবারে। অন্য দিনগুলোর তুলনায় এদিন মেলায় বিক্রিও ছিল বেশি। তবে লোকসমাগমের তুলনায় মানুষের হাতে হাতে বইয়ের সংখ্যা ছিল কমই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের দিনগুলোতে মেলায় প্রকৃত পাঠকদের উপস্থিতিই ছিল বেশি এবং তাদের সবার হাতেই থাকত বই।
মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক  বলেন, ‘পাঠক বেড়েছে। অনেকগুণ বেড়েছে। জনসংখ্যাও তো বেড়েছে। বইয়ের বাজারও বেড়েছে। তবে সেটা সৃজনশীল বা মননশীল বইয়ের চেয়ে টেক্সটবুকই সেই বাজার বেশি দখলে রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে প্রকাশকও কম ছিল, বই প্রকাশ হতো কম। এখন প্রকাশকের সঙ্গে বইয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু বইয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।’
দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশনা ব্যবসায় সম্পৃক্ত মাহমুদুল হক বলেন, ‘অনেক অনেক চকচকে বই প্রকাশিত হচ্ছে। এসব বই পাঠকদের প্রলোভিত করছে। কিন্তু এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এতে পাঠক ঠকছে, বইয়ের প্রতি আগ্রহও হারিয়ে ফেলছে। আর প্রকাশকরা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ পাঠকরা ওই প্রকাশকদের বই কিনতে দ্বিতীয়বার ভাবছেন। এটা সার্বিকবাবে প্রকাশনা শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।’

প্রায় একই কথা বলেন লেখক জাকির তালুকদারও। তিনি বলছিলেন, ‘বইমেলাতেই বই প্রকাশ করতে হবে— এমন একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে। প্রকাশকরাও বিনামূল্যে প্রচারের সুযোগে এই মানসিকতাতে সায় দিয়ে থাকেন। এতে প্রকাশক, প্রকাশিত বই ও পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা ততটা বাড়েনি।’
জাকির তালুকদার আরও বলেন, ‘বর্তমানের বইমেলায় প্রকাশকদের এক ধরনের অসাধু ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটছে। এতে মানহীন বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এই মান ঠিক করবে কে? এটা ঠিক করার কথা প্রকাশকদের, কিন্তু তারা তা করছেন না। ফলে মেলার পরিসর বাড়লেও এতে আদৌ লাভ হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।’
গত কয়েক ব্ছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বইমেলায় প্রতিবছর তিন থেকে চার হাজার নতুন বই ছাপা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘এত বইয়ের মধ্যে তিন থেকে চারশ বই মানসম্মত। বাকিগুলো শুধু সংখ্যা বাড়াতে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে কারও লাভ হচ্ছে না। এই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’
প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক অবশ্য ততটা হতাশ নন। তিনি বলছিলেন, ‘ক্রমান্বয়ে বইয়ের কাটতি বেড়েছে। আমি মনে করি, সৃজনশীল বা মননশীল বইয়ের বাজার আরও বাড়বে। এটা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ এছাড়া, এখনকার মেলায় আন্তর্জাতিক ছাপ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Responsive WordPress Theme Freetheme wordpress magazine responsive freetheme wordpress news responsive freeWORDPRESS PLUGIN PREMIUM FREEDownload theme free

hit counter