সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরা তেমন বোঝেন না, ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না-ঢাবি অধ্যাপক

ডেস্ক:পরীক্ষাব্যবস্থার সমালোচনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, সৃজনশীল পদ্ধতির অকার্যকারিতা৷ এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও মনে করেন, “বাংলাদেশে সৃজনশীল পদ্ধতি মেধা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছে না৷”
ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরা তেমন বোঝেন না, ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না৷ পরীক্ষার সময় এটা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এই জন্য যে, কী প্রশ্ন করবেন তা প্রশ্নকর্তা নিজেও বোঝেন না৷ ফলে তিনি নোট, গাইডবুকের ওপর নির্ভর করেন৷ ফলে এই পদ্ধতিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না৷”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, “সৃজনশীল পদ্ধতি চলবে না৷ সৃজনশীল কোনো কাজ দিচ্ছে না৷ মাল্টিপল চয়েসও ঠিক না৷”

তার মতে, ‘‘বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন থাকবে, ছেলে মেয়েরা লিখে জবাব দেবে৷এই বিষয় সম্পর্কে সে যা জানে সেটা লিখবে৷ এর মাধ্যমে তার জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যাবে৷ তার ভাষাজ্ঞানেরও পরীক্ষা হবে৷ ভাষাজ্ঞানটাও শিক্ষা ব্যবস্থার একটা জরুরি অংশ৷”

ডয়চে ভেলে: উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হচ্ছে৷ এই পদ্ধতিতে কি শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যাচ্ছে?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, আমরা পারছি না৷ সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরাও তেমন বোঝেন না৷ ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না৷ পরীক্ষার সময় এটা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে এই জন্য যে, কী প্রশ্ন করবেন প্রশ্নকর্তা নিজেও তা বোঝেন না৷ ফলে তিনি গাইডবুক, নোট এগুলোর উপর নির্ভর করেন৷ সেখান থেকেই তিনি এই প্রশ্নের ধারণা তৈরি করেন৷ প্রশ্ন হওয়া উচিত বই থেকে, ছাত্ররা যা পড়েছে৷ সৃজনশীলের আগে ‘মাল্টিপল চয়েস’ নামে একটা পদ্ধতি ছিল, সেটাও ঠিক ছিল না৷ ওখানে দেখা যেত একটা ‘টিক’ দিয়েই নম্বর পেয়ে যেত৷ এর অসুবিধার দিকটা হলো, এটার জন্য তো ওভাবে ঠিকমতো পড়ানোও করতে হয় না৷ দ্বিতীয়ত হলো, কেউ বোঝে না৷ আর তৃতীয়ত হলো, ছাত্ররা নম্বর পাওয়ার উপরই জোর দেয়, কীভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে৷ বিষয়ের বাইরে গোটা বইটা যে পড়বে, বুঝবে সে ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই৷ এখন ছাত্রদের লিখতে উৎসাহিত করতে হবে৷ যেটা সে বুঝল, সেটা সে সঠিকভাবে লিখতে পারে কি-না৷ তাহলে বোঝা যাবে সে জানে কি-না এবং সে নিজের বোঝাটাকে প্রকাশ করতে পারে কি-না৷ লেখার উপর জোর দিতে হবে৷ সেজন্য সৃজনশীল দরকার নেই, মাল্টিপুল চয়েসেরও দরকার নেই৷ সরাসরি প্রশ্ন হওয়া উচিত৷

এখন পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় গ্রেডিং পদ্ধতিতে৷ আগে ছিল বিভাগ৷ বর্তমান পদ্ধতিটা কি সঠিক?

না, এটার খুব প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয় না৷ আগের পদ্ধতিটা যে খারাপ ছিল তা আমার মনে হয় না৷ এখানে বোঝাও যায় না ছাত্রটার মেধাটা কেমন, অন্যদের মধ্যে তার অবস্থানটা কী৷ এগুলো খুবই বিভ্রান্তিকর৷ আগেরটায় সরাসরি নম্বর জানা যেত, কে কতটা ভালো করল বোঝা যেত, আসলে আগেরটাই ঠিক ছিল বলে আমার মনে হয়৷

এই যে নতুন পদ্ধতিগুলো আসছে, তাতে কি শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক যাচাই হচ্ছে?

না, মেধার সঠিক যাচাই হচ্ছে না৷ পাশাপাশি মেধার বিকাশে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না৷ এখন সমস্ত গুরুত্ব হচ্ছে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার উপরে৷ ছাত্ররা ক্লাস রুমে ঠিকমত পড়ে কিনা, শিক্ষকরা ঠিকমত ক্লাস নিচ্ছে কি-না, সময় দিচ্ছেন কি-না, শিক্ষকদের কতটা আগ্রহ আছে, তাদের প্রশিক্ষন আছে কি-না এবং তারা মনোযোগ দিয়ে পড়াচ্ছেন কি-না এখন এইগুলো দেখা হয় না৷শিক্ষক শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে আছেন৷ শিক্ষক নির্বাচন এখানে খুব ভ্রান্ত পথে হয়, নানান প্রভাবে হয়৷ যার ফলে অযোগ্য লোকরা এখানে আসেন৷ এই অযোগ্য লোক আসার ফলে তাদের কোনো রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না৷ যদি শিক্ষক ভালো মতো না পড়ান, তাহলে পরীক্ষা দিয়ে কী হবে, কিসের পরীক্ষা হচ্ছে, ছেলে-মেয়েরা তো পড়েই নাই৷ তখন ছেলে-মেয়েরা নোট বই, গাইড বই – এগুলোর উপর নির্ভর করে, কোচিং সেন্টারে যায়, তারা মনে করে কোচিং সেন্টারে না গেলে পাশ করা যাবে না৷ শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারকে যদি ক্লাস রুমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাহলে সেটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত বলেই আমার মনে হয়৷

সম্প্রতি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে তুমুল বিতর্ক হয়েছে৷ সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাদের ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবস কবে তা-ও জানে না৷ এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এটা তো খুব একটা ব্যতিক্রম বলে আমি মনে করি না৷ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এরকমই অবস্থা৷ এখন ছেলে-মেয়েদের তো আর সেভাবে পড়ানো হচ্ছে না, জানার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে না৷ শুধু নম্বর পাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হচ্ছে৷ তাছাড়া সাধারণ জ্ঞানের চর্চাকেও কোনোভাবে উৎসাহিত করা হয় না৷ সাধারণ জ্ঞানটা যে ক্লাস রুমে বা ক্লাস রুমের বাইরে জানানো হবে, সেটা একেবারে করা হচ্ছে না৷ এই থেকে বোঝা যাচ্ছে সাধারণ জ্ঞানের স্তরটা নেমে গেছে৷

এরা শুধু নম্বর পাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী, অন্য কিছু জানার ব্যাপারে আগ্রহী নয়৷ অভিভাবকরাও চান, তাদের ছেলে মেয়েরা ভালো নম্বর নিয়ে আসুক৷ তারা পাঠ্যপুস্তক জানবে বা বাইরের জ্ঞান আহরণ করবে এটা অভিভাবকরা দরকারই মনে করেন না৷ তারা মনে করেন, গ্রেড কী পেল সেটাই মুখ্য৷ ভালো গ্রেড পেলে তারা মনে করেন, ছেলে-মেয়েরা ভালো করেছে৷ কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা তো পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়৷ তার তো সাধারণ জ্ঞান থাকতে হবে৷ না হলে একজন মানুষকে আমরা শিক্ষিত বলব কিভাবে? কাজেই আমরা শিক্ষিত মানুষ তৈরি করতে পারছি না বলেই আমি মনে করি৷

গত দুই বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে কি-না – এ নিয়েও বিতর্ক চলে আসছে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি পক্ষীক্ষায় মাত্র ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন৷ অন্যরা পাসই করতে পারেনি৷ কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হবে মেধাক্রম অনুযায়ী৷ আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কেমন হওয়া উচিত?

বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাক্রম অনুযায়ী ভর্তি হওয়া উচিত না৷ এই মেধার উপর তো নির্ভরই করা যাচ্ছে না৷ শিক্ষার্থীরা যে সমস্ত গ্রেড নিয়ে আসছে, নম্বর নিয়ে আসছে তা তো বিশ্বাসযোগ্য না৷ বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই ছাত্রদের বাছাই করার স্বাধীনতা দিতে হবে৷ মান অনুযায়ী ছাত্রদের ভর্তি করবে৷ সে কারণে পরীক্ষা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগই নেই বলে আমি মনে করি, কেননা, তাহলে তো নির্ভর করতে হবে ওই যান্ত্রিক নম্বরগুলোর উপরে৷ এটা তো কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় নয়৷

শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ তো দেখাই যাচ্ছে৷ এখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে আপনার পরামর্শ কী?

প্রথমত দেখতে হবে যে, উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা আমরা করতে পারছি কিনা৷ উপযুক্ত শিক্ষক মানে, যারা যোগ্য, যাদের আগ্রহ আছে এবং যারা সময় দিতে পারেন৷ আর সেজন্য শিক্ষকদের দুটো জিনিস নিশ্চিত করতে হবে৷ একটা হলো, তাদের যথাপোযুক্ত বেতন-ভাতা দিতে হবে৷ এবং দ্বিতীয়ত, সামাজিক যে সম্মান সেটা তাদের দিতে হবে৷ শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান তো কমে গেছে৷ এর জন্য স্কুল কলেজ বা যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে কী ঘটছে তার একটা জবাবদিহিতা থাকা উচিত৷

প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে৷ আর এই জবাবদিহিতা শুধু সরকারিভাবে করা যাবে না, সেটা সামাজিকভাবেও করতে হবে৷

সামাজিকভাবে করার উপায় হলো, যে পরিচালনা কমিটি আছে, সেই কমিটি যাতে যথাপোযুক্তভাবে গঠিত হয়৷ এতদিন এমপিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হতেন৷ এটা খুবই খারাপ একটা বিষয় ছিল৷ এটা বাদ হয়েছে, এটা ভালো৷ এখন দেখতে হবে, প্রকৃত শিক্ষানুরাগীরা ওই কমিটিতে নির্বাচিত হচ্ছেন কিনা৷ টাকার জোরে বা টাকা উপার্জনের জন্য ওই কমিটিতে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা উচিত৷ শিক্ষানুরাগী, প্রাক্তন শিক্ষক, সমাজের যারা শিক্ষিত মানুষ তাদেরই পরিচালনা কমিটিতে আনা উচিত৷

এসএসসি ও এইচএসসিতে যে পরীক্ষা পদ্ধতি আছে তা কি সঠিক বলে মনে করেন?

আমার বক্তব্য হলো, এই যে সৃজনশীল পদ্ধতি এটা চলবে না৷ সৃজনশীল কোনো কাজ দিচ্ছে না৷ মাল্টিপল চয়েসও আমি পছন্দ করব না৷ আমি পছন্দ করব এমন পদ্ধতি যেখানে বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন থাকবে, ছেলে-মেয়েরা লিখে জবাব দেবে৷ এই বিষয় সম্পর্কে সে যা জানে সেটা লিখবে৷ এর মাধ্যমে সে তার জ্ঞানের পরিচয় দেবে৷ এবং সে তার জ্ঞানকে প্রকাশ করতে পারছে কি-না সেটাও ধরা পড়বে৷ তার ভাষা জ্ঞানটাও পরীক্ষিত হবে৷ ভাষা জ্ঞানটাও শিক্ষা ব্যবস্থার একটা জরুরি অংশ বলে আমি মনে করি৷ –ডি ডব্লিউ

Facebooktwitterredditpinterestlinkedinmail

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিক্ষক কিভাবে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদমর্যাদার হন?

মাহফিজুর রহমান মামুন: শিক্ষার আলো বিস্তার প্রথমে শুরু হয় যাঁদের হাত দিয়ে, সেই প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা বেতন পদমর্যাদায় এখনো চরমভাবে অবহেলিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দু’ধরনের শিক্ষক রয়েছেন—প্রধানশিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক। আগে ...

প্রাথমিক মানসম্মত শিক্ষায় বাধা শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মে সম্পৃক্ত করা

স্বরুপ দাস: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের কারণে সমাজে ও পরিবারে নানাবিধ সমস্যা ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। ফলে বেশিরভাগ পরিবারে দ্বন্দ্ব ও কলহ বিরাজ করে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। শিক্ষা সম্পৃক্ত ...

প্রাথমিক প্রধান শিক্ষকদের ভাগ্যাকাশের কালোমেঘ

এস এম সাইদুল্লাহ: প্রধান শিক্ষক ভাগ্যাকাশের কালোমেঘ এখনও কাটেনি! এর আগে প্রধান শিক্ষক পদের মতো বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের আর কোনো পদ নিয়ে এতো ষড়যন্ত্র হয়নি!! সত্যি সেলুকাস!!!প্রয়োজন ত্বরিত সাংগঠনিক পদক্ষেপ গণমাধ্যমের ...

সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা : করণীয়

সালমা আক্তার নিশু,১৭ জুন : শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা মজবুত না হলে মাধ্যমিক, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা সফল হবে না। তাই শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক ...

hit counter